কুমিল্লায় নির্ধারিত সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হঠাৎ করে বাতিলের ঘটনাটি এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সরাসরি জবাবদিহিহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত অবমাননার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কুমিল্লা ও চাঁদপুরের সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ শেষ মুহূর্তে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা ছাড়াই বাতিল করা হয়। এই অস্বচ্ছ ও একতরফা সিদ্ধান্ত স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
এই আয়োজনকে ঘিরে কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করেছিল। সাংবাদিক নির্বাচন থেকে শুরু করে ভেন্যু নির্ধারণ—সবকিছুই করা হয়েছিল পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। প্রায় ৪০০ কর্মরত সাংবাদিকের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ৩০ জনকে নির্বাচন করা হয়, যেখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা বিতর্কিত পরিচয়কে কঠোরভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। এমন একটি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর হঠাৎ করে কোনো আলোচনা ছাড়াই প্রশিক্ষণ বাতিল করা শুধু দুঃখজনক নয়—এটি চরম অমর্যাদাকর।
শুধু তাই নয়, এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার সুপরিচিত রেস্টুরেন্ট চায়না গার্ডেনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। অর্থাৎ আয়োজনের প্রতিটি দিকই ছিল সুসংগঠিত ও বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। এমন অবস্থায় শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান বাতিল করা সংশ্লিষ্ট সকলের শ্রম, সময় ও সম্মানকে উপেক্ষা করার শামিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরবর্তীতে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে—নির্বাচিত সাংবাদিকরা নাকি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বা অতীতের রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী—তা প্রমাণবিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এমন গুরুতর অভিযোগ আনা হলে তার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে দেখা গেছে, অভিযোগ আছে—প্রমাণ নেই; সিদ্ধান্ত আছে—ব্যাখ্যা নেই।
এই ধরনের আচরণ কেবল সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদেরই নয়, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজকে অপমানিত করেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে এখন যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করছেন, তাদের পেশাগত মর্যাদা ইচ্ছাকৃতভাবে খর্ব করা হয়েছে এবং একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগকে অযৌক্তিকভাবে ভণ্ডুল করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—কোনো প্রতিষ্ঠানের কি এমন একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকতে পারে, যেখানে তারা কোনো পূর্ব নোটিশ, আলোচনা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাতিল করতে পারে? যদি অভিযোগ সত্যিই থাকে, তবে তা প্রমাণসহ প্রকাশ করা হোক। আর যদি না থাকে, তবে এই সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার করে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। সেই গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি এ ধরনের অবজ্ঞা শুধু ব্যক্তি বা অঞ্চলের প্রতি নয়—এটি পুরো পেশার প্রতি অবমাননা। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নিরূপণ এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এখন আর দাবি নয়—এটি অপরিহার্য। নীরবতা এখানে কোনো সমাধান নয়; বরং এটি অবিচারকে আরও বৈধতা দেয়। এখন সময় এসেছে স্পষ্ট জবাব দেওয়ার।
শুভেচ্ছান্তে,
মীর্জা ফসিহ্ উদ্দিন আহমেদ (শাহীন মির্জা), সভাপতি কুমিল্লা জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন