শুরুতে স্টারমার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে লেবার পার্টির অন্তত দুজন প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী স্পষ্ট করে জানান, তারা দলীয় নেতৃত্বের জন্য তাকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন। আর পার্লামেন্টে যে দলের আসন সবচেয়ে বেশি থাকবে, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হবেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত লেবার পার্টিই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে থাকবে।এদিকে ব্রেক্সিটের অন্যতম রূপকার এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র নাইজেল ফারাজ এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়েছেন।
দুই প্রধান দলই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা ভোটারদের সামনে নিজেকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। তার দল রিফর্ম ইউকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এর মাধ্যমে দলটি ব্রিটিশ রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে মূলধারার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক দশকে ব্রিটেনে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনা দেশটির ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক আনুগত্য এবং কার্যত দুই-দলীয় ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত বহন করে। এই পরিস্থিতিতে জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে নাইজেল ফারাজ ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির আরও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসতে পারেন।
জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান মোর ইন কমনের যুক্তরাজ্য পরিচালক লুক ট্রাইল বলেন, '২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচন মূলত পরিবর্তনের পক্ষে ভোট ছিল। মানুষ বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো ও ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি। আর এ কারণেই রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত আছে।’
গত ১০ বছরে কারা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী?
২০১৬ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। গড়ে প্রতি দেড় থেকে দুই বছর পরপরই নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে।
ডেভিড ক্যামেরন ২০১৬ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি ব্রেক্সিট ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ছিলেন। তবে গণভোটে পরাজিত হন। থেরেসা মে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে ব্যর্থ হন তিনি। বরিস জনসন ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। একাধিক কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক চাপ তাকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। লিজ ট্রাস ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ঋষি সুনাক ২০২৪ সালে ক্ষমতা ছাড়েন। সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।
সবশেষে পদত্যাগ করলেন কিয়ার স্টারমার।
দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রবার্ট ওয়ালপোল। তিনি ১৭২১ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। আধুনিক সময়ে মার্গারেট থ্যাচার ১১ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। টনি ব্লেয়ার ছিলেন প্রায় ১০ বছর। সবচেয়ে কম সময় দায়িত্বে ছিলেন লিজ ট্রাস। তার মেয়াদ ছিল মাত্র ৪৯ দিন।
এখন কী হবে?
অ্যান্ডি বার্নহাম বর্তমানে এগিয়ে রয়েছেন। তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া ওয়েস স্ট্রিটিংও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারেন। প্রার্থী হতে হলে ৮১ জন লেবার পার্টির সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। এরপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচন হতে পারে। তবে সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নির্বাচিত হয়
যুক্তরাজ্যের ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। বরং ভোটাররা নিজেদের নির্বাচনি এলাকার প্রতিনিধিত্বের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের সদস্য নির্বাচন করেন। সাধারণত যে দলের নেতা হাউস অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে যেকোনো সময় তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে, এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও। যদি তিনি দলের পর্যাপ্ত সদস্যের আস্থা হারান, তবে তাকে সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কোনো দলীয় নেতা পদত্যাগ করলে বা পদচ্যুত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদও হারান।
এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বদলানো সম্ভব। তবে ক্ষমতাসীন দল নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে। যুক্তরাজ্যের আইনে সর্বোচ্চ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ক্ষমতাসীন সরকার চাইলে তার আগেও নির্বাচন দিতে পারে।
সাধারণত কোনো সরকার যদি মনে করে সংসদে আরও বেশি আসন জিতে নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে পারবে, অথবা জনসমর্থন কমে যাওয়ার চাপ থেকে আগাম নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
গত এক দশকে এমন ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। ফলে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
সূত্র: সিবিসি নিউজ, আল-জাজিরা