এটা সুপ্রসিদ্ধ যে ভারতবর্ষে রাজনৈতিকভাবে ইসলামের আগমন ঘটেছিল সিন্ধু অঞ্চলে। সেটা ৯৩ হিজরির কথা। এর বহু বছর আগে ওমর (রা.)-এর শাসন আমলে (১৫ হিজরি) মালাবর ও সরনদ্বীপে (শ্রীলঙ্কা) ইসলামের সুবাস ছড়াতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় উমাইয়া আমল পর্যন্ত আরবের বহু বুজুর্গ ও দরবেশ দক্ষিণ ভারতে তাওহিদের বাণী প্রচার করতে আগমন করেন। ভারতবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক শাসক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের ভেতর মালাবারের রাজা অন্যতম। (আয়নায়ে হাকিকত নামা, পৃষ্ঠা ৭১-৭২)
মুসলমানের আগমন, তাদের অবস্থান, মুসলিম বিজয় ভারতবর্ষের জন্য ছিল স্রষ্টার আশির্বাদ। তারা ভারতবাসীর জন্য ঈমান, ইসলাম ও সভ্যতার আলো নিয়ে এসেছিল। ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় মুসলিম আগমনের প্রভাব ছিল অভাবনীয়। আল্লামা শিবলি নোমানি (রহ.) এই বিষয়ে লেখেন, ‘ভিনদেশী কর্তৃক কোনো দেশ বা অঞ্চল জয় করা অন্যায় নয়। নতুবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজেতা সবচেয়ে বড় অন্যায়কারী হতেন। দেখার বিষয় হলো, বিজয়ী জাতি দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে কি অবদান রেখেছেন। যুদ্ধের জয় বিবেচনা করলে চেঙ্গিস খান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজেতা। কিন্তু তাঁর উপখ্যানের প্রতিটি হরফ রক্তে রঞ্জিত। বিপরীতে যখন কোনো সভ্য জাতি কোনো দেশ বা অঞ্চল জয় করে তখন সেখানের সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায়। যোগাযোগ মাধ্যমে, জীবন-জীবিকা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘর-বাড়ি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ব্যবসার উপকরণ, শিল্প ও পেশা সবকিছুতে নতুনত্ব চোখে পড়ে। বিজিত জাতি যদিও বিজয়ীদের কৃতিত্ব অস্বীকার করে তবুও ঘর-বাড়ি ও দেয়ালগুলো শত শত বছর ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে। (ইসলামী হুকুমত আওয়ার হিন্দুস্তান মে উসকা তামাদ্দুনি আসর, পৃষ্ঠা ১-২)
ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত মুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতা ছিল এবং তা ছিল আঞ্চলিক। ফলে এই সময়ে ইসলাম ভারতীয় সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এখানে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বড় অভাব ছিল। ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সম্রাট জহির উদ্দিন বাবর। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে ভারত জয় করেন। ভারতে এসে তিনি এখানকার সামাজিক অবস্থা দেখে বিস্মিত হন। ভারতবাসীদের জীবনযাত্রা ও সভ্যতা তাঁর কাছে অত্যন্ত পশ্চাত্পদ বলে মনে হয়। বাবরের বর্ণনায় তত্কালীন ভারতের অবস্থা ছিল নিম্নরূপ—‘ভারতে ভালো ঘোড়া নেই, উত্কৃষ্ট মাংস নেই, আঙুর নেই, তরমুজ নেই, বরফ নেই, ঠাণ্ডা পানি নেই, গোসলখানা নেই, মাদরাসা নেই, মোমবাতি নেই, এমন কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই যা সর্বত্র কাজে লাগতে পারে; মশাল নেই, মোমবাতির স্ট্যান্ড নেই। আরও বলছেন, বাগান ও অট্টালিকাগুলোতে প্রবাহমান পানির ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলোতে না আছে পরিচ্ছন্নতা, না আছে সুষম পরিকল্পনা, না উপযুক্ত বায়ুপ্রবাহ, না আছে স্থাপত্যগত সামঞ্জস্য। সাধারণ মানুষ খালি পায়ে শুধু লঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ায়। নারীরাও লুঙ্গি ব্যবহার করে, যার এক অংশ কোমরে পেঁচিয়ে রাখে এবং অপর অংশ মাথার ওপর ফেলে দেয়।’ (ইসলামী হুকুমত অওর হিন্দুস্তান মে উসকা তামাদ্দুনি আসার, পৃষ্ঠা ২-৩)
