যুদ্ধের মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজায় আহত বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া সাংবাদিকরা জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন।
প্রতিদিন সকালে ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ আল-কাহৌজি এমন একটি জীবনকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা যুদ্ধ প্রায় কেড়ে নিয়েছিল। ৪০ বছর বয়সী এই ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী বলেন, সাংবাদিকতায় ফিরে আসা এখন তার জন্য যেমন মানসিক সংগ্রামের, তেমনি শারীরিক চ্যালেঞ্জেরও। প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টে তার চোয়াল, হাত ও পিঠে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ব্যথা তাকে বাধা দেয়।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দক্ষিণ গাজায় নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার পর থেকেই তিনি এই ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছেন। সেদিন তিনি আল জাজিরার সাংবাদিক হামজা আল-দাহদুহ ও মুস্তাফা আবু থুরাইয়ার সঙ্গে কাজ করছিলেন।
তারা গাড়ির দিকে ফেরার পথে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান তাদের মিডিয়া টিমকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে আল-দাহদুহ ও আবু থুরাইয়া নিহত হন এবং আল-কাহৌজি গুরুতর আহত হন।
আল-কাহৌজি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম এবং গাড়ি চালিয়ে যেতে থাকি, কারণ আমরা কখনো ভাবিনি যে ধ্বংসযজ্ঞের পরের পরিস্থিতি তুলে ধরা সাংবাদিকরাই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ‘
তিনি আরও বলেন, ‘প্যারামেডিকরা আমাকে হামজা আল-দাহদুহের মরদেহের ওপর রেখেছিল, কারণ তারা ভেবেছিল আমি মারা গেছি। পরে তারা বুঝতে পারে আমি তখনও বেঁচে আছি।’
গাজায় আটকে থাকা জীবন
বিস্ফোরণে তার চোখ থেকে শুরু করে একটি বড় ধমনী পর্যন্ত মুখের অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। চিকিৎসকরা তার গালে টাইটানিয়ামের প্লেট বসান। ডান হাতে গুরুতর টেন্ডন ও জয়েন্টের ক্ষতি হয় এবং আঘাতের মাত্রার কারণে একটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়।
মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে তার পায়ের নিচের অংশে স্থায়ী অসাড়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটা এখন তার জন্য কঠিন।
দুই বছরেরও বেশি সময় পরও তার শরীরে ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। এ পর্যন্ত তিনি ২৫টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করিয়েছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, তার আরও পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন, যা শুধু গাজার বাইরে সম্ভব।
এখন তিনি দ্বিধায় রয়েছেন—একদিকে তিনি গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধের বাস্তবতা নথিভুক্ত করে যেতে চান, অন্যদিকে চান বিদেশে গিয়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা নিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে।
নিজের পুরোনো বাড়ি ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি বোমা হামলায় ধ্বংস হওয়ার পর থেকে ভাড়া করা একটি জরাজীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে বসে আল-কাহৌজি বলেন, তিনি আবার সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমি আবার কাজ করতে চাই। এটাই আমার একমাত্র আয়ের উৎস। কিন্তু আমার শরীর আমাকে আগের মতো কাজ করতে দিচ্ছে না।’
“আমার আঘাতগুলো আমার কাজের সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ কেড়ে নিয়েছে। এখন আমার স্বপ্ন খুব সাধারণ—চিকিৎসা পাওয়া এবং সেই মাঠে ফিরে যাওয়া, যেখানে আমি বছরের পর বছর অন্য মানুষের গল্প তুলে ধরেছি।”
আহত সাংবাদিকদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি
বুধবার গাজা সিটিতে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সিন্ডিকেট (PJS)-এর সদর দপ্তরের সামনে আহত ও অসুস্থ সাংবাদিকদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আহত সাংবাদিকরা যুদ্ধে নিহত ২৬৩ জন মিডিয়া কর্মীর কয়েকজনের ছবি হাতে ধরে ছিলেন।
পিজেএস-এর মহাসচিব আহেদ ফারওয়ানা বলেন, বর্তমানে ৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক যুদ্ধজনিত গুরুতর আঘাত বা এমন রোগে ভুগছেন, যার চিকিৎসা শুধু গাজার বাইরে সম্ভব।
সিন্ডিকেট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে চিকিৎসা নথি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছে এবং সাংবাদিকদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি চিকিৎসা শেষে তাদের ফিরে আসার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
ফারওয়ানা বলেন, ‘চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। যুদ্ধ, অবরোধ বা চলাচলের নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অধিকার কখনো কেড়ে নেওয়া উচিত নয়।’
সিন্ডিকেট আহত সাংবাদিকদের গাজা ছাড়তে বাধা দেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুধু “উদ্বেগ প্রকাশের বিবৃতি” দেওয়ার বাইরে আরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাদের সমালোচনা করেছে।
ফারওয়ানা বলেন, ‘সাংবাদিকরা যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে এই যুদ্ধের দলিল তৈরি করেছেন। আজ তাদের অনেকেই শুধু বেঁচে থাকার সুযোগ চাইছেন।’
অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই
৩৪ বছর বয়সী ফটোসাংবাদিক মোয়াজ আল-সালহির জন্য প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ছিল ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার জন্যও তাকে কয়েকটি ব্যথানাশক ওষুধ খেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে চাই। আমি মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে থাকব না। ওষুধ ছাড়া আমি দাঁড়াতেই পারতাম না।’
আল-সালহির ২০২২ সালে গুরুতর ক্রোনস রোগ ধরা পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইসরায়েলে তার জৈবিক চিকিৎসা শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে তিনি বারবার জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে পড়ছেন। তিনি নিজের ফোনে হাসপাতালের ভর্তি হওয়ার ছবি ও চিকিৎসার নথি দেখান। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তার শারীরিক অবস্থা এত খারাপ হয় যে তিনি জ্ঞান হারান এবং আবার হাসপাতালে নিতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করি রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, যাতে কাজ চালিয়ে যেতে পারি। কিন্তু যখনই মনে হয় একটু ভালো হচ্ছি, আবার ভেঙে পড়ি।’
এখন তিনি ক্যামেরার সরঞ্জামের পাশাপাশি ওষুধও সঙ্গে রাখেন। কখনও কখনও পরিস্থিতি উল্টে যায়—তিনি আর সংবাদ সংগ্রহকারী নন, তিনিই হয়ে যান সংবাদ।
তিনি বলেন, ‘এমন দিন গেছে যখন হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা লাগানো অবস্থায়ও আমি খবর কভার করেছি। আমি ক্লান্ত ছিলাম, কিন্তু মানুষের গল্প বলতে চেয়েছিলাম। এখন আমিই সেই গল্পের অংশ। এখন আমারই চিকিৎসা দরকার।’
রোগটি তার শরীরে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে। তিনি অনেক ওজন হারিয়েছেন এবং প্রতিবার অসুস্থ হওয়ার পর শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তার সবচেয়ে বড় ভয় হলো—গাজায় আটকে থেকে যদি একসময় তার অবস্থা আর ফেরানো সম্ভব না হয়।
দুই সন্তানের বাবা আল-সালহি বলেন, “আমার পরিবার ভয় পায় যে একদিন আমার শরীর আর এই চাপ সহ্য করতে পারবে না। আমি সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে চাই না।”
গাজা থেকে বের হওয়ার কঠিন পথ
আল-সালহির জীবন বাঁচাতে এখন গাজা ছাড়ার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অসাধারণ কিছু চাই না। আমি শুধু চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ চাই, পরিবারের কাছে ফিরতে চাই এবং যে কাজটি ভালোবাসি সেটি আবার করতে চাই।’ কিন্তু আল-সালহি ও গাজার অন্যান্য আহত ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পথে রয়েছে বড় বাধা।
ইসরায়েল গাজায় কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে মানুষের প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা অনেক মানুষ গাজার ভেতরেই আটকে আছেন।
একই সময়ে, গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এমন অনেক রোগের চিকিৎসাও সম্ভব হচ্ছে না, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গাজার ভেতরেই করা যেত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিও এইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজায় ১৮,৫০০-এর বেশি রোগীর জরুরি চিকিৎসা সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, কারণ তাদের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা স্থানীয়ভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সীমিত সংখ্যক রোগীই কেবল চিকিৎসার জন্য বের হতে পেরেছেন। হাজারো মানুষ এখনও অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
রাফাহ সীমান্ত—যা গাজা থেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বের হওয়ার প্রধান পথ—ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে সীমিত ও মাঝে মাঝে খোলা হয়েছে, যার মাধ্যমে অল্প সংখ্যক অসুস্থ ফিলিস্তিনি ও তাদের সহযাত্রীরা মিশর বা অন্য দেশে চিকিৎসার জন্য যেতে পেরেছেন।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ গুরুতর আহত, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বিলম্বিত করছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
চেয়ারম্যান: জুয়েল খন্দকার
অফিসঃ ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হটলাইনঃ +৮৮০ ১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ই-মেইলঃ songbadtv1@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ টিভি