যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবার নজর এখন টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের দিকে। বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রিপাবলিকান আধিপত্য শেষ করে ডেমোক্র্যাটরা এবার সিনেটের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের রদবদল আনতে পারবে কি? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মার্কিন রাজনীতির ময়দানে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে টেক্সাস এখন একদম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তিন দশকের দীর্ঘ রিপাবলিকান জয়ের ধারা ভেঙে একটি আসন ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ ডেমোক্র্যাটদের জন্য যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি এই জয়ের মাধ্যমে তারা নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথও বহুগুণে প্রশস্ত করতে পারে।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সিনেটর জয়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ১৯৯৮ সালে লয়েড বেন্টসনের পুনর্নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো ডেমোক্র্যাট এই রাজ্য থেকে সেনেটর নির্বাচিত হতে পারেননি। বেন্টসনের ছেড়ে দেওয়া আসনে ডেমোক্র্যাট বব ক্রুগার অল্প সময়ের জন্য মনোনীত সেনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ১৯৯৩ সালের জুনে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টেক্সাস রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই টিকে রয়েছে। তবে এবার সেই চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জেমি ট্যালেরিকো। সম্প্রতি প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ট্যালেরিকো রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের চেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন অথবা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সমানে সমান অবস্থায় রয়েছেন। যদিও এই অগ্রগামিতার বড় অংশই জরিপের সম্ভাব্য ভুলসীমার ভেতরে পড়ে।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই জয় টেক্সাসের রাজনৈতিক ইতিহাসেও ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের অনেকের কাছেই রাজনীতির এই দীর্ঘ ইতিহাস কিংবা সমীকরণের চেয়েও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যদিনের জীবনযাত্রার ব্যয়। প্রতিদিনের খাবার আর বেঁচে থাকার খরচ মেটাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন নাগরিকরা। হিউস্টনের বাসিন্দা জন ম্যাককারি টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সবকিছুরই অনেক দাম। শুধু প্রতিদিন খাওয়া-দাওয়া করতেই বিশ থেকে ত্রিশ ডলার খরচ হয়ে যায়। প্রতিটা দিন বেঁচে থাকা এখন ব্যয়বহুল। একই ধরনের চাপের কথা তুলে ধরেছেন হিউস্টনের আরেক বাসিন্দা হিদার ব্রমফিল্ড। পরিবারের বাজেট সামলাতে গিয়ে তিনি অনুযোগ করে জানান, সবকিছুর দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন জীবনযাত্রা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
এই সাধারণ পরিবারের চাপগুলোই এখন টেক্সাসের এই জাতীয় গুরুত্ব পাওয়া নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। রিপাবলিকানরা যেখানে সেনেটে তাদের সামান্য ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত, সেখানে টেক্সাসের এই ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে পুরো সিনেট কার দখলে যাবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প টেক্সাসে প্রায় ১৩.৭ শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু তার ঠিক দুই বছর পরেই এত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচন পরীক্ষা করে দেখছে প্যাক্সটন কতটা রিপাবলিকান সুবিধা ধরে রাখতে পারেন ট্যালেরিকোর বিরুদ্ধে। প্রাথমিক দলীয় বাছাইপর্বে রিপাবলিকান প্রার্থী প্যাক্সটন বিদায়ী সেনেটর জন কর্নিনকে পরাজিত করায় পার্টিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়েছে, তাও আবার এমন একটি আসনে যেখানে জয় তাদের জন্য সর্বদাই সুনিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া হতো।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট টেক্সাসকে সেই সাতটি রাজ্যের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে যা সেনেট নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধে মূল ভূমিকা পালন করবে। রিপাবলিকানদের নিজস্ব এই সুরক্ষিত ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত লড়াই পুরো দলের হিসাব-নিকাশ জটিল করে তুলেছে এবং অন্যান্য রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পাশাপাশি নিজের দুর্গ সামলানোর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। টেক্সাসে জয় পেতে হলে প্রার্থীকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হয়। হিউস্টন, ডালাস, অস্টিন ও সান আন্তোনিওর মতো বিশাল মেট্রোপলিটন শহরের পাশাপাশি এখানে রয়েছে দ্রুত বর্ধনশীল শহরতলি ও বিস্তৃত গ্রামীণ অঞ্চল। তদুপরি বিশাল লাতিনো ভোটার গোষ্ঠী উভয় দলের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যাদের সমর্থন কোনো প্রার্থীই নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারছেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডেমোক্র্যাটিক দলের এই অগ্রগতির দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব লুকিয়ে আছে এর ফলাফলের ভেতরে। এই ঐতিহাসিক জয় কি কেবল এই দুই প্রার্থীর নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতার প্রতিফলন, নাকি এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য টেক্সাসে স্থায়ী কোনো নতুন দরজার উন্মোচন—সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। একটি মাত্র নির্বাচন হয়তো এই বড় প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেবে না, তবে এটি উভয় দলের অর্থ খরচ, প্রার্থী বাছাই এবং জয়ের সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
ভবিষ্যদ্বাণীর বাজার ব্যবহার করে পরিচালিত একটি নির্বাচনী মডেলেও টেক্সাসকে সিনেটের ভাগ্য নির্ধারণী রাজ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রে ফেয়ার প্রিডিকশন মার্কেটের মূল্যের ভিত্তিতে ১৪টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যকে র্যাঙ্কিং করে টিআরটি ওয়ার্ল্ডের সাথে একটি বিশ্লেষণ শেয়ার করেছেন। তার মডেলের ধরে নেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটদের এই ১৪টি রাজ্যের মধ্যে অন্তত ৮টিতে জিততে হবে, যার একদম সীমান্ত বা মূল থ্রেশহোল্ডে অবস্থান করছে টেক্সাস। র্যাঙ্কিংয়ের হিসাব ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক ফেয়ার বলেন, র্যাঙ্কিংয়ের অনুমিত তথ্য অনুসারে, ডেমোক্র্যাটরা যদি টেক্সাসে জয়লাভ করে, তবে তারা এই তালিকার ওপরে থাকা বাকি সবকটি রাজ্যেই জয় পাবে।
অধ্যাপক ফেয়ারের মডেলে টেক্সাস হলো সেই মূল রাজ্য, যেখানে সেনেটে ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা আর ট্যালেরিকোর জয়ের সম্ভাবনা একেবারে হুবহু এক। তবে এই সম্পর্কটি পুরোপুরি বাজারের আনুমানিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত, কোনো সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী নিয়মের ওপর নয়। বাস্তবে ভোটের ফলাফল হুবহু প্রেডিকশন মার্কেট মেনে নাও চলতে পারে এবং ডেমোক্র্যাটরা র্যাঙ্কিংয়ে টেক্সাসের ওপরে থাকা কিছু রাজ্যে হেরেও টেক্সাসে জিতে যেতে পারে। এদিকে ফেয়ারের দেওয়া হিসাবের পর প্রেডিকশন মার্কেটের দাম আরও পরিবর্তিত হয়েছে। অক্টোবরের শেষের দিকে কালশি এবং পলিমার্কেটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ট্যালেরিকোর জয়ের সম্ভাবনা ৭০ শতাংশের কাছাকাছি দেখানো হচ্ছিল, যা আগের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি।
অবশ্য এসব পরিসংখ্যান কেবল বাজারের প্রত্যাশাকে নির্দেশ করে যা প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে এবং এটিকে কোনোভাবেই প্রকৃত ভোটিং জরিপের সাথে মিলিয়ে ফেলা উচিত নয়। রিপাবলিকানদের জন্য এই নির্বাচন নিজেদের সুপরিচিত দুর্গ হাতছাড়া না করার পরীক্ষা, আর ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় জোটকে বাস্তবে বড় জয়ের রূপ দেওয়ার পরীক্ষা। নভেম্বরের এই ভোটের লড়াই পার হয়ে যাওয়ার পরও উভয় দল গভীর নজর রাখবে যে টেক্সাসকে যা প্রতিযোগিতামূলক করে তুলল, সেই একই রাজনৈতিক বাতাস দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব কি না। সূত্র: টিআরটি
চেয়ারম্যান: জুয়েল খন্দকার
অফিসঃ ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হটলাইনঃ +৮৮০ ১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ই-মেইলঃ songbadtv1@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ টিভি