সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই সমুদ্রপথে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে চীন—এমন অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে তাইওয়ান। বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক তৎপরতা মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যসহ সমমনা দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যে তাইপেই প্রতিনিধি কার্যালয়ের রাষ্ট্রদূত ভিনসেন্ট চিন-হসিয়াং ইয়াও। তাঁর দাবি, চীনের তথাকথিত ‘গ্রে-জোন’ কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এসব কথা বলেন তিনি। নিবন্ধে ইয়াও উল্লেখ করেন, সমুদ্রে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর এমন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না জড়িয়েও এসব রাষ্ট্র অন্য দেশের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি এবং নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেন তাইওয়ানের এই প্রতিনিধি। তিনি জানান, গত বছর রাশিয়ার গবেষণা জাহাজ ‘ইয়ান্তার’ দুবার ব্রিটিশ জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। এ সময় জাহাজটির নাবিকদের পানির নিচের যোগাযোগ ক্যাবলের আশপাশে অবস্থান করতে দেখা যায়। পাশাপাশি ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর পাইলটদের লক্ষ্য করে লেজার নিক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে বাল্টিক সাগরে একটি চীনা জাহাজের নোঙর টেনে নিয়ে যাওয়ার কারণে কয়েকটি ফাইবার-অপটিক ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেন তিনি। এসব ঘটনার মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোর অবস্থান ও দুর্বলতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইয়াও।
তবে তাঁর উদ্বেগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক তৎপরতা। ইয়াওয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর তাইওয়ানের জাতীয় দিবস পালনের পরদিনই চীন সামরিক মহড়ার ঘোষণা দেয়। এর এক দিনের মধ্যে গোলাবর্ষণসহ সরাসরি সামরিক মহড়া শুরু হয়। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাইওয়ানের গণতান্ত্রিক স্বশাসনের প্রতি বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, আগাম সতর্কতা ছাড়াই এ ধরনের সামরিক মহড়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ও বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়মকানুনের পরিপন্থী। এতে নৌ ও আকাশপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
২০২৫ সালে তাসমান সাগরেও চীনা নৌবাহিনীর আগাম সতর্কতা ছাড়া গোলাবর্ষণের মহড়ার বিষয়টি তুলে ধরেন ইয়াও। তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে একজন বিমানচালকের সতর্কবার্তার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া এ বিষয়ে জানতে পারে।
তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামুদ্রিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, দ্বীপটির পূর্বদিকে চীনা জাহাজের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ তল্লাশির মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কার্যত তাইওয়ানকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সক্ষমতা তৈরি করছে বেইজিং।
এ ধরনের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতে রূপ নিলে তার প্রভাব শুধু তাইওয়ান বা পূর্ব এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ব্লুমবার্গের হিসাবের বরাত দিয়ে ইয়াও বলেন, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে তাইওয়ানে উৎপাদিত গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টরের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও শিল্প উৎপাদন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে গোয়েন্দা তথ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা জোরদার এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাইওয়ানের প্রতিনিধি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি এবং সমুদ্রসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মকানুন সমুন্নত রাখতে যুক্তরাজ্যসহ সমমনা দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ।