মানুষের জীবনে কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, যা কাউকে বলা যায় না, আবার নীরবে বয়ে বেড়ানোও সহজ নয়। কিছু কষ্ট আসে আপন মানুষের কাছ থেকে, কিছু আঘাত আসে তাদের কাছ থেকে, যাদের একসময় নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করা হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা তখনই হয়, যখন নিজের সর্বস্ব দিয়ে কারও পাশে দাঁড়ানোর পর একদিন সেই মানুষগুলোর কাছেই নিজের অস্তিত্বের মূল্য খুঁজে পাওয়া যায় না। মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রের জীবনবোধের কথাগুলোতে উঠে এসেছে এমনই কিছু তিক্ত বাস্তবতা। সহজ-সরল বিবেক, মানবিকতা ও মনুষ্যত্বকে ধারণ করে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের জীবন বাজি রেখেও কিছু মানুষের উপকার করেছেন। কারও প্রতি সম্মান, বিশ্বাস ও দেওয়া ওয়াদার মর্যাদা রাখতে গিয়ে নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই মানুষগুলোর অনেকেই যেন ভুলে গেছেন অতীতের উপকার, ভুলে গেছেন কারও আন্তরিকতা ও আত্মত্যাগের কথা।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, প্রয়োজনের সময়ে যাদের কাছে একজন মানুষ ছিল আপন, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের কাছেই সে হয়ে যায় অবহেলার পাত্র। যখন উপকারের হিসাব কাগজে-কলমে বুঝে নেওয়া শেষ হয়, তখন অনেকের আচরণও বদলে যায়। অথচ উপকার কখনো কেবল হিসাবের খাতায় মাপা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস, সম্পর্ক, আত্মত্যাগ এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা। শুভ্রের কথায়, প্রতিদিন মৃত্যু কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। মৃত্যু একদিন সবারই আসবে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে করা অন্যায়, অবহেলা ও অকৃতজ্ঞতার স্মৃতি অনেক সময় জীবিত অবস্থাতেই মানুষকে বারবার বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। একজন মানুষ হয়তো একবার মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত মানুষ প্রতিদিনই মানসিক যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়।
জীবনের আরেকটি নির্মম উপলব্ধি হলো, সৃষ্টিকর্তার দেওয়া চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখা যায়, কিন্তু সবকিছু দেখা সবসময় আশীর্বাদ হয়ে আসে না। কখনো কখনো অন্যের জন্য দেখতে গিয়ে নিজের সর্বনাশও চোখের সামনে দেখতে হয়। অন্যের বিপদ, অন্যের প্রয়োজন, অন্যের অসহায়ত্ব বুঝতে গিয়ে নিজের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়, সুযোগ ও শান্তি বিসর্জন দিতে হয়। অথচ দিনশেষে সেই মানুষগুলোর কাছ থেকেই প্রত্যাশিত সম্মানটুকু পাওয়া যায় না। আসলে মানুষকে চেনা যায় না তার সুন্দর কথায়, বড় বড় প্রতিশ্রুতিতে কিংবা সুসময়ের আন্তরিকতায়। মানুষকে চেনা যায় প্রয়োজনের মুহূর্তে, বিপদের সময়ে এবং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ালে। ভালো সময়ে চারপাশে অনেক আপনজনের ভিড় থাকে। হাসি, ভালোবাসা ও সম্পর্কের উষ্ণতায় সবকিছু সুন্দর মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় যখন একজন মানুষ বিপর্যস্ত হয়, তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় কার আপনত্ব সত্যিকারের, আর কার সম্পর্ক কেবল প্রয়োজনের স্বার্থে গড়ে ওঠা।
সময় বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় অনেক মানুষের আচরণও। যাদের একসময় নিজের মানুষ মনে হয়েছিল, তারাই একদিন দূরত্ব তৈরি করে। কেউ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, কেউ অতীত অস্বীকার করে, আবার কেউ এমন আচরণ করে যেন কোনোদিন কোনো সম্পর্কই ছিল না। তবে এসব অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। শেখায়, সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না। সবাইকে নিজের সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত সহযোগিতা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ মানবিকতা দুর্বলতা নয়, আর সরলতা কখনো কারও কাছে নিজেকে অসম্মানিত করার অনুমতিপত্র হতে পারে না। তারপরও মানুষের উপকার করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। তবে উপকার করতে হবে বিবেক দিয়ে, দায়িত্ববোধ থেকে, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়। কারও জন্য নিজের জীবনকে বিপন্ন করে দেওয়ার আগে এটুকু মনে রাখা জরুরি, নিজের জীবন ও মর্যাদার প্রতিও নিজের দায়িত্ব রয়েছে।
মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রের উপলব্ধি যেন সেইসব মানুষের মনের কথাই প্রকাশ করে, যারা মানুষের জন্য অনেক কিছু করেও দিনশেষে অবহেলা, অবিশ্বাস ও অকৃতজ্ঞতার শিকার হয়েছেন। হয়তো একদিন সব অভিযোগ থেমে যাবে। থেমে যাবে অভিমান, থেমে যাবে মানুষের কাছে নিজের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা। কিন্তু জীবনের কঠিন সময়ে কে পাশে ছিল, কে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আর কার জন্য নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিতে হয়েছিল, সেই স্মৃতিগুলো সহজে মুছে যায় না।কারণ সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় স্বার্থের হিসাব শেষ হওয়ার পর। আর মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তখনই, যখন তার কাছ থেকে পাওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
চেয়ারম্যান: জুয়েল খন্দকার
অফিসঃ ১০/৩, টয়েনবি সার্কুলার রোড, ৫ম তলা, মতিঝিল ঢাকা-১০০০
হটলাইনঃ +৮৮০ ১৯৮৮৬৬৩৭৮২, ই-মেইলঃ songbadtv1@gmail.com
স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ টিভি