কিছু আমল মানুষের ঈমানকে আলোকিত করে। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। আত্মাকে পবিত্র করে তোলে। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, সাহাবি আবু মালিক আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পবিত্রতা হলো ঈমানের অর্ধেক অংশ। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মিযানের পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দিবে এবং ‘সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ’ আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দিবে।
‘সলাত’ হচ্ছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি। ‘সদকা’ হচ্ছে দলীল। ‘ধৈর্য’ হচ্ছে জ্যোতির্ময়। আর ‘আল কোরআন’ হবে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ। বস্তুত: সকল মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে (আল্লাহর আজাব থেকে) মুক্ত করে অথবা সে তার নিজের ধ্বংস সাধন করে। (মুসলিম, হাদিস : ৪২২)
এই হাদিসে ঈমানের বাস্তব রূপ ও মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও গভীর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি বাতলে দেওয়া হয়েছে, ঈমানকে পরিচর্যা করার মৌলিক ধাপগুলো। নিম্নে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা হলো;
ঈমানের অর্ধেক পবিত্রতা : হাদিসের শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।’ এখানে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় পবিত্রতার কথাই বোঝানো হয়েছে। অজু, গোসল ও পরিচ্ছন্নতা যেমন বাহ্যিক পবিত্রতা, তেমনি হৃদয়কে অহংকার, হিংসা ও কপটতা থেকে মুক্ত করা হলো আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা।
এসব বিষয় থেকে পবিত্র হওয়া ছাড়া মহান আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসা পাওয়া যায় না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)
অতএব, ঈমানকে পূর্ণাঙ্গ করতে হলে, মহান আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসা পেতে হলে, মানুষের অন্তর ও আচরণ উভয়কেই পরিশুদ্ধ করতে হবে।
সালাত মানুষের জীবনের আলো : মহানবী (সা.) নামাজকে মানুষের জীবনের জ্যোতি বলেছেন। এর কারণ হলো, নামাজ মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে তাকে সঠিক পথ দেখায়। অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
যে ব্যক্তি পরিপূর্ণ ইখলাস ও খুশু-খুজুর সহিত নিয়মিত নামাজ আদায় করে, তার চরিত্র ও আচরণে সেই আলোর প্রতিফলন দেখা যায়। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম ও জীবনধারা সবই আলোকিত হয়ে ওঠে।
সদকা ঈমানের প্রমাণ : হাদিসে বলা হয়েছে, ‘সদকা বুরহান; অর্থাৎ সদকা ঈমানের প্রমাণ। মানুষ আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস থেকে তার সন্তুষ্টির আশায় নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ ব্যয় করে। এটি তার অন্তরের বিশ্বাসের বাস্তব প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হলো যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, এতিম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দি-মুক্তিতে এবং যে নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকি। (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ প্রকৃত মুমিন বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে তাদের কিছু গুণ উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো, সম্পদের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর রাস্তায় সদকা করা।
ধৈর্য ও কোরআনের পথনির্দেশ : হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘ধৈর্য উজ্জ্বল আলো।’ মানুষ যখন আল্লাহর পথে কষ্ট সহ্য করে, পাপ থেকে বিরত থাকে এবং বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করে, তখন সেই ধৈর্য তাকে আলোর পথে পরিচালিত করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৫)
এছাড়া কোরআন সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি মানুষের পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষী হবে। যে ব্যক্তি কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে, কোরআন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে; আর যে তা অবহেলা করবে, কোরআন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
অতএব, কোনো মানুষ যদি ঈমানের আলোয় আলোকিত হতে চায়। মহান আল্লাহ প্রিয় হতে চায়, দুনিয়া-আখিরাতে শানিত ও নিরাপত্তা চায় তাকে অবশ্যই এই গুণগুলো অর্জন করতে হবে।