• রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ন

যাত্রীদের কল্যাণের নামে নিজে টাকার পাহাড় গড়েছেন মোজাম্মেল

স্টাফ রিপোর্টার / / ৪৪ Time View
Update : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

পরিবহন যাত্রীদের কল্যাণের নামে “বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি” প্রতিষ্ঠা করে অল্প সময়েই নিজের কল্যাণে কোটিপতি বনে গেছেন সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। সংগঠনের নামে প্রভাব বিস্তার করে গোপনে নিজে গড়েছেন টাকার পাহাড়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর সাথে ছবি দিয়ে পোস্টার টাঙিয়ে এতাদিন প্রভাব বিস্তারের পর এখন সুর পাল্টানোর চেষ্টা করছেন এই মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নামে লাইসেন্সবিহীন সিএনজি অটোরিকশার রমরমা ব্যবসা ছাড়াও অঢেল সম্পত্তি। আর সেই সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা ভাগিয়ে নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির দায়েরকৃত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আবার বিভিন্ন দপ্তরে তদবির বাণিজ্য, সড়কে নিয়ম ভেঙে সুবিধা আদায়, বিআরটিএ’র মিরপুরসহ বিভিন্ন অফিসে দালালির অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অর্থ, সম্পদ ও ব্যবসার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে।

জানা গেছে, মোজাম্মেল হক চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের ইমামুল্লাহ চরের পূর্ব পাড়ায়। তার বাড়িতে দুটি ঘর ছিল। এর মধ্যে বড় ঘরটির চারপাশে মাটির দেয়াল, ওপরে টিনের ছাউনি। তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছেন। গত এক যুগ ধরে পরিবহনের যাত্রীদের অধিকার আদায়ের নামে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র নামে সংগঠন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নিহত ও চাঁদাবাজি নিয়ে সোচ্চার বক্তব্য রাখেন। যাত্রীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আন্দোলনও করেন। তবে এই যাত্রী কল্যাণ সমিতির আড়ালে নিজের আখের গড়ে তুলেছেন। গত ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় মোজাম্মেল গ্রেফতার হন। আর একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে তার স্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ‘তার স্বামী (মোজাম্মেল হক চৌধুরী) একটি অনলাইন গণমাধ্যমে অল্প টাকা বেতনে কাজ করেন। সেই টাকা দিয়ে তাদের সংসার চালানো হয়।

সূত্র জানায়, মোজাম্মেল হক চৌধুরীর গোপন সম্পত্তির মালিক হয়েছে। তার অর্থের বেশিরভাগই ব্যয় করা হয়েছে জমি ক্রয়ে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর মৌজায় দেড় কোটি টাকায় ৩৪৫ শতাংশ জমি কিনেছেন। দলিলে মৌজা অনুযায়ী, জমির যে দাম দেখানো হয়েছে প্রকৃতপক্ষে সেই জমির আনুমানিক মূল্য ৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর তার নামে রেজিস্ট্রি হওয়া জমির দলিলে তিনি চার দফায় ৪টি দলিলের মাধ্যমে হাশিমপুর মৌজায় বিভিন্ন দাগে ৩৪৫ শতক জমি ক্রয় করেছেন। রেজিস্ট্রি দলিলে সেই জমির মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪২ হাজার টাকা। তবে স্থানীয়দের দাবি, মোজাম্মেলের কেনা জমির প্রকৃত বাজারমূল্য তার কয়েকগুণ বেশি হবে।

জমির দলিল মোতাবেত ২০১৯ সালের ২৩ জুন চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া সাব রেজিস্ট্রার অফিসে তার নামে প্রথম দলিলটি রেজিস্ট্রেশন (নম্বর ১৬৬২) করা হয়। ওই দলিলে ১ একর ৬০ শতাংশ (চার কানি) জমি কেনেন মোজাম্মেল। যার দাম দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। এরপর একই বছরের ২৩ জুলাই ১৫ শতক জমির দ্বিতীয় দলিলটি রেজিস্ট্রি (দলিল নং ১৯০৮) করা হয় মোজাম্মেলের নামে। দলিলে জমির দাম ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়। এর মাত্র এক মাসের মাথায় একই বচরের ১৬ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দলিল রেজিস্ট্রেশন (নম্বর ২৪৪১) করা হয় তার নামে। জমির পরিমাণ ৩৭ দশমিক ৫০ শতক। দলিলে এই জমির দাম দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। চতুর্থ দফায় ৮ দিন পর ২৩ সেপ্টেম্বর আরেকটি জমি কিনেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী। রেজিস্ট্রেশন (নম্বর ২৫৩৮) হওয়া জমির পরিমাণ ১৩২ দশমিক ৫০ শতক। জমিটির দাম উল্লেখ করা হয়েছে ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এতে চার দফায় ৪টি দলিলে মোট ৩৪৫ শতক জমি কিনেছেন মোজাম্মেল হক এবং দলিলে এই জমির মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪২ হাজার টাকা। অথচ আরো কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রাখা হয়েছে গোপনে।

নাম না করার শর্তে স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানান, মোজাম্মেলের অবস্থা আগে খবুই শোচনীয় ছিল। গত ২০০৯ সালের দিকে তৎকালীন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জাকারিয়ার পাওনা টাকা না দেওয়ায় মোজাম্মেলকে আটকে রেখেছিলেন। এরপর সেই পাওনা টাকা পেতে স্ট্যাম্পে লিখিত দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। এরপর থেকেই মোজাম্মেল ঢাকায় এসে যাত্রী কল্যাণ নামে যাত্রীদের কল্যাণের নামে প্রতারণার পথে পা বাড়ান।

অপর সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট ছাড়া প্রায় ২ শতাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন সাংবাদিক সমিতি’র নামে। প্রতিটি গাড়িতে সাঁটানো হয়েছে সমিতির ব্যানার। ওই ব্যানারে ‘সাংবাদিক’ মোজাম্মেল হক চৌধুরীর নাম ও ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। আর ওই পরিচয়ের কারণে সেই সব সিএনজি অটোরিকসার চালকদের রাস্তায় ডিউটিরত সার্জেন্ট বা পুলিশের কোন হয়রানী হতে হয় না।

গাড়ীর রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট ছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে মোজাম্মেলের ইশারায়। সেখান থেকে মাসিক চাঁদা হিসেবে তার পকেটে লাখ লাখ টাকা ঢুকছে। আর স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ স্বেচ্চাসেবক লীগের নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা করে এসব অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হন। তার অপকর্মের বিরোধিতা করায় অনেকেই হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, মোজাম্মেল হক চৌধুরী অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে প্রভাবশালীদের সঙ্গে ওঠাণ্ডবসা করছেন। আর সেই সুবাধেই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তিনি পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুন মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছবি দিয়ে পোস্টার করেছেন। ওই পোস্টারে তিনি লিখেছেন, “দেশের যাত্রী আন্দোলনের প্রবক্তা তরুণ সাংবাদিক বোয়ালখালীর কৃর্তি সন্তান বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব মো. মোজ্জামেল হক চৌধুরীকে, ঢাকা মেট্রো: আরটিসি ও চট্ট মেট্রো: আরটিসি’র সদস্য মনোনীত করায় জননেত্রী শেখ হাসিনা ও মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। নিচে লেখা রয়েছে, “ যাত্রী কল্যাণ সমিতি” চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিন ও মহানগর। নিজেকে পরিচয় দেন সাংবাদিক ও পরিবহন সমিতির নেতা হিসেবে। কোটি টাকার সম্পত্তির তথ্য গোপন রাখতেই সাধারণ জীবনযাপন করেন মোজাম্মেল। তবে পাল্টে গেছে তার কথার ধরন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রভাব খাটিয়ে বিআরটিএতে দালালি করেই তিনি সবচেয়ে বেশী টাকার মালিক হয়েছেন। আর সেই টাকায় কিনেছেন কোটি টাকার সম্পত্তি। ঢাকায় রয়েছে তার একটি প্রাইভেট কার যার আনুমানিক মূল্য ১২-১৫ লাখ, একটি নোহা গাড়ি যার আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ ও চট্টগ্রামে একটি অত্যাধুনিক প্রাইভেট কার রয়েছে। মোজাম্মেলের স্ত্রী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার পদে প্রার্থী হয়ে ৩০ ভোট পেয়েছিলেন। মোজাম্মেল নিজেও উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে জামানত বাজেয়াপ্ত হন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন গত ২৩ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি জিডি করেন। আবার মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে জিডির পর সিএমএ আদালতে মামলা করা হয়েছে। ৫৫১ নাম্বার মামলায় ৫০০, ৫০১ ও ৫০৬ তিনটি ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তনাধীন রয়েছে।

এদিকে “অতীতের বৈষম্য দূর করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়সহ অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণপরিবহনের আইন ও বিধি-বিধান তৈরি, ভাড়া নির্ধারণ, গণপরিবহনের যাত্রী সাধারণের সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণসহ যেকোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

গত ৮ অক্টোবর বিকালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার দফতরে অন্তরবর্তীকালীন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে বৈঠকে এ দাবি জানান সংগঠনটি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহনের প্রধানতম স্টেকহোল্ডার ১. যাত্রী বা জনগণ ২. বাস মালিক সমিতি ৩. শ্রমিক সংগঠন ৪. সরকার। জনসাধারণের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা বাস মালিক সমিতি, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ। এই কাজের একমাত্র রাজস্ব যোগানদাতা যাত্রী তথা দেশের জনগণ। আবার বলা হয়েছে, “পরিবহন খাতে নির্লজ্জ দলীয়করণ, চাদাঁবাজি, ধান্ধাবাজি, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা চরম আকার ধারণ করেছে”।

সম্প্রতি একটি অনলাইন গণমাধ্যমে “যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী” বলেছেন, ‘বিগত সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি, মালিক-শ্রমিকদের তোষামোদির প্রতিবাদ করায়, যাত্রী অধিকার ও সড়ক নিরাপত্তায় সোচ্চার থাকায় বিগত সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর বিরাগভাজন হওয়ায় যাত্রী কল্যাণ সমিতিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিলেন।

তিনি এখন ভোল পাল্টিয়ে চাঁদাবাজির কৌশল হিসেবে অন্তরবর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আতাঁত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
এখন আবার বর্তমান সরকারের আমলে নিজেকে আলোচনায় আসার চেষ্টা করছেন এই মোজাম্মেল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category