• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৪ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
কুমিল্লায় সাঁড়াশি অভিযানে আটক ৩৮৫, শ্রমিক অসন্তোষে উসকানির অভিযোগে গ্রেপ্তার ১ উপকারের প্রতিদান যখন অবহেলা, তখন নীরবতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় জবাব, মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র যবিপ্রবি ফিল্ম সোসাইটির পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন: সভাপতি সামিউল, সম্পাদক শ্রেয়া হোমিও চিকিৎসক নাসির উদ্দিনের মৃত্যুতে সম্মিলিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পরিষদের গভীর শোক প্রকাশ চন্দ্রকোনায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে মির্জা মোস্তফা কুমিল্লা জামেয়া দারুল হুদা মাদ্রাসায় সবক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত সাংবাদিক নির্যাতনের বিচার না হওয়ায় বাড়ছে হামলা, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মুক্ত সাংবাদিকতা মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন, ইতিহাস বদলে দেয়ার ইতিহাস র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেললো আফগানিস্তান সংসদ ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুপারিশ

চীনের সহায়তা আফগানিস্তানে জন-ভোগান্তি বাড়াচ্ছে?

অনলাইন ডেস্ক / ২১ Time View
Update : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ খনি ও নির্মাণ খাতে গত কয়েক বছরে নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে চীন। তবে এই বৃহৎ বিনিয়োগে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনমান ও সুরক্ষার বিষয়টি কোনো প্রাধান্যই পাচ্ছে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বহু পশ্চিমা দেশ তাদের দূতাবাস খালি করে দেয়। কিন্তু চীন দেখে অন্য এক সুযোগ। নিজের পশ্চিম সীমান্তের ঠিক পাশেই আমেরিকান সামরিক শক্তির উপস্থিতির অবসানের পর বেইজিং নিজের প্রভাব বিস্তারে তৎপর হয়ে ওঠে।

অধিকাংশ দেশ আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলেও চীন কাবুলে তাদের কূটনৈতিক মিশন খোলা রাখে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে থাকে। তালেবানও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষার যে শর্তাবলি পশ্চিমা দেশগুলো জুড়ে দেয়, বেইজিং সে ধরনের কোনো শর্ত ছাড়াই অর্থের জোগান ও সহায়তা দিতে সম্মত ছিল। ফলে নিজের মুনাফা নিশ্চিত করতে এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সানন্দে মেনে নেয় বেইজিং।

বর্তমানে আফগানিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। তালেবান সরকারও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে অত্যন্ত সক্রিয়। কাবুলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত চীনা মালিকানাধীন গুইইয়ান হোটেলে কর্মরত আহমদ (ছদ্মনাম) জানান, প্রতি সপ্তাহে হোটেলটিতে কয়েক ডজন চীনা নাগরিক থাকেন। কেবল কাবুলই নয়, অন্যান্য প্রদেশেও চীনাদের পরিচালিত এমন অনেক হোটেল গড়ে উঠেছে। আফগান প্রশাসনও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করছে। পররাষ্ট্র, খনি ও পেট্রোলিয়াম এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চীনা ভাষা জানা শত শত আফগান নাগরিককে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে তারা চীনা পরিদর্শকদের সাহায্য করতে পারে। তারা বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন খনি এলাকা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে এবং বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাচ্ছে। ফলে এক দিকে চীনা কোম্পানিগুলো নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ পাচ্ছে, অন্য দিকে তালেবান পাচ্ছে তাদের রাজস্ব বাড়ানোর বড় মাধ্যম। যেমন, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘চায়নিজ সিটিজেনস ইউনিয়ন’-এর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে চীনা ব্যবসায়ীদের ভিসা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চীনা কোম্পানি ‘সিনজিয়াং সেন্ট্রাল এশিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড গ্যাস’-এর সঙ্গে আমু দরিয়া নদীর অববাহিকা থেকে তেল উত্তোলনের জন্য ২৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করে তালেবান। সেখানে প্রায় ৫৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে দলটি। লোগার প্রদেশের মেস আইনাকে কপার খনি প্রকল্পেও চীনের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে পূর্ববর্তী আফগান সরকারের আমলে ৩০ বছরের একটি চুক্তি সই হলেও নিরাপত্তা, শ্রম ও পরিবেশগত নানা সংকটের কারণে দীর্ঘদিন সেই কাজ বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালে এসে তালেবান সরকার পুনরায় চুক্তিটির অনুমোদন নিশ্চিত করে এবং চীনা কোম্পানিগুলোও সেই স্থগিত কাজ দ্রুত শুরু করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

তবে এই বিনিয়োগের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে স্থানিক পর্যায়ে। ২০২৩ সালের আগস্টে তাখার প্রদেশের চাহ আব জেলায় অবস্থিত সামতি স্বর্ণ খনিটি চীনের একটি যৌথ কোম্পানিকে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ স্থানীয় খবরের সূত্রে জানা যায়, খনিতে স্বর্ণ উত্তোলন পুরোদমে শুরু হয়েছে। তবে তা নিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রবল বিরোধ তৈরি হয়। স্থানীয় আফগানদের অভিযোগ, তারা খনির অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত, উল্টো খনি এলাকার পরিবেশ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তাদেরই বইতে হচ্ছে। একইভাবে বদখশান প্রদেশের স্বর্ণ খনি প্রকল্পেও স্থানীয় মানুষ তাদের জমি ও পানি সরবরাহের অধিকার হারাচ্ছেন, যা এই অঞ্চলের জলবায়ুর ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও চীন এখন তালেবানকে আফগানিস্তানের শাসক হিসেবে বিবেচনা করে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তারা এখনও এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। তালেবান কাবুলে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত একমাত্র রাশিয়া ছাড়া আর কোনো দেশই তালেবানকে আনুষ্ঠানিক বৈধতা দেয়নি। তবে ২০২৩ সালে চীনই প্রথম দেশ হিসেবে তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে তাদের নতুন রাষ্ট্রদূত পাঠায় এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তালেবান রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। একই বছরে আফগান পণ্যে কোনো শুল্ক না নেওয়ার সুবিধাও চালু করে চীন। কৌশলগত স্তরেও দুই দেশের গভীর ঘনিষ্ঠতা দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের এপ্রিলে উরুমচিতে তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় চীন সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।

বেইজিং অবশ্য মুখে কয়েকবার অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার এবং নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছিল, তবে তালেবানরা তা অমান্য করার পরও চীন তাদের সঙ্গে কাজ বন্ধ করেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, চীনের এই মনোভাব তালেবানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগকে দুর্বল করে দিয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশও তাদের অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর সুবিধার্থে তালেবানদের সঙ্গে চুক্তির পথে হাঁটছে, যা তালেবানের এই স্বৈরাচারী কাঠামোর পরিবর্তনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

এই পুরো সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ আফগান জনগণ। খনি সংলগ্ন এলাকার মানুষের কোনো মতামত বা অধিকারকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সামতি এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, খনি প্রকল্পের কারণে তাদের কৃষি জমি ধ্বংস হয়েছে, পানির উৎসে বাধা এসেছে, অথচ এলাকার কোনো রাস্তাঘাট, পানি অবকাঠামো বা স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালে তালেবানরা সেই বিক্ষোভ কঠোর হস্তে দমন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও স্থানীয় মানুষ জমি ও সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ না পেয়ে বিক্ষোভ করেছিল। তবে তারা কোনো বিচার পায়নি। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, যখন চাহ আব জেলায় সংঘর্ষে তিন জন স্থানীয় বাসিন্দা ও একজন খনি কর্মী প্রাণ হারান এবং পাঁচ জন আহত হন। পরে তালেবানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোম্পানির কার্যক্রম স্থগিত ও দুই জনকে গ্রেফতার করার কথা জানালেও, কোম্পানির নাম ও মালিকের পরিচয় গোপন রাখে। আফগান জনগণ সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলেও কোনো ফল পাচ্ছে না, কারণ খনি হস্তান্তরের মূল সিদ্ধান্তের পেছনেও রয়েছে একই তালেবান প্রশাসন।

দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে যোগাযোগের সুবিধাও তৈরি করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে চীন, পাকিস্তান করিডোর আফগানিস্তান পর্যন্ত সম্প্রসারণে নীতিগত সম্মতি দেয়। এছাড়া ২০২৬ সালের অক্টোবরে ওয়াকান করিডোরের মধ্য দিয়ে চীন সীমান্তের দিকে একটি ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁচা রাস্তা উদ্বোধন করে তালেবান। রাস্তাটি পাহাড়ি ও সুরক্ষিত বনাঞ্চলের ওপর দিয়ে তৈরি হওয়ায় এখনো এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য পথ হিসেবে চালু হয়নি কিন্তু এটি তৈরি হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান আরও সহজ হবে।

চীন সরকারের নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তাও এই অঞ্চলে গভীর প্রভাব রাখছে। বেইজিংয়ের মূল উদ্বেগের জায়গা হলো, উইঘুর স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী ‘ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট’ যেন আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে জিনজিয়াং প্রদেশে কোনো ধরনের অশান্তি না ঘটাতে পারে। জাতিসংঘ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তালেবানের অধীনে আফগানিস্তানে এই গোষ্ঠীটির সদস্যরা অবাধে বিচরণ করছে এবং তালেবান পুলিশ বাহিনীতেও তাদের কিছু সদস্যকে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, আফগানিস্তানের বাঘরাম সামরিক ঘাঁটিতে আবার যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ঘটার আশঙ্কাকেও চীন প্রতিহত করতে চায়। চীনের গোপনীয় পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র লোপ নুর থেকে মাত্র ২ হাজার কিলোমিটার দূরে এই ঘাঁটির অবস্থান। সে কারণে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চীন, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তান যৌথভাবে আফগানিস্তানে যেকোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা আফগানিস্তান তাই গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। খনি ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে আসা আয় তালেবানদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে চীনা কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষা আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সহ্য করতে তালেবানকে আরও সক্ষম করবে।

সূত্র: ন্যাশনাল ই্ন্টারেস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category