• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৩:১১ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করছে একটি চক্র মন্ত্রীত্ব এতো কঠিন জানলে আমি দায়িত্ব নিতাম না: কৃষিমন্ত্রী কুমিল্লায় তিন কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেফতার  ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক টিপুর্দি দুর্ঘটনা নিহত ২ “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬” চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে উদ্ধোধন: তারেক রহমান বুড়িচংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাঁদপুর সফর উপলক্ষে মতবিনিময় সভা কালিরবাজার ইউনিয়ন বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মনিরুল হক চৌধুরী কুমিল্লা ০৮ কেজি গাঁজা সহ মাদক ব্যবসায়ী ছকিনা বেগম গ্রেফতার ‘আমি নির্বাচিত হলে ঢাকা দক্ষিণের বাসিন্দাদের আর ময়লার বিল দিতে হবে না’ পানিতে নিজের ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে জমিতেই কৃষকের মৃত্যু

খেলা হবে-সিন্ডিকেট, কাদেরের কালো অধ্যায়- ২

অনলাইন ডেস্ক / / ১৭৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫

কাদেরের স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের, ভাই আবদুল কাদের মির্জা, ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, নোয়াখালীর সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরী ও সাবেক সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহকে নিয়ে ওবায়দুল কাদের গড়ে তোলেন দুর্নীতির সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নামই ছিল ‘খেলা হবে’। তার মন্ত্রিত্বকে অবৈধ ক্ষমতা চর্চার হাতিয়ার করে ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সড়ক পরিবহন খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করে হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছে কাদের পরিবার ও সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা।

১৬ বছরে ওবায়দুল কাদেরের নিজের নির্বাচনি হলফনামায় দেওয়া তথ্যে সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ পাওয়া গেছে ছয় গুণের বেশি। যদিও হলফামায় দেওয়া টাকার অঙ্কের সঙ্গে বাস্তবের অনেক ফারাক থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে হলফ নামায় নেই বিদেশে পাচারকৃত অবৈধ সম্পদের হিসাব।

কাদেরের পরিবারসহ সিন্ডিকেটের অন্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য এক আইনজীবী দুদকে আবেদন দাখিল করেছেন। তার আবেদন ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া অভিযোগ আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানে অধিকাংশ অভিযোগেরই সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই কমিশন থেকে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে বেশ কিছু দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে। সড়ক ও সেতু নির্মাণ কিংবা পরিবহন ক্রয়ে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকের গোয়েন্দা বিভাগ খতিয়ে দেখেছে। প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর কমিশন থেকে প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সওজের মোট কাজের ৯০ শতাংশ করেছে ১২-১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো একক ও যৌথভাবে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকার কাজ পায়। নানা কৌশলে নির্ধারিত কমিশনের বিনিময়ে সুনির্দিষ্ট ওইসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিত কাদের সিন্ডিকেট। কাকে কাজ দেওয়া হবে, তা আগেই ঠিক করে রাখা হতো। এরপর দরপত্র ডাকার আনুষ্ঠানিকতা করা হতো।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হাসান টেকনো বিল্ডার্স, রানা বিল্ডার্স, এনডিই, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ, মো. মঈনউদ্দিন (বাঁশি) লিমিটেড, তাহের ব্রাদার্স, মোহাম্মদ আমিনুল হক লিমিটেড, মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার্স, স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স, এম/এস সালেহ আহমেদ, এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স, রিলায়েবল বিল্ডার্স, তমা কনস্ট্রাকশন, মাহফুজ খান লিমিটেড ও আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন ইত্যাদি।

কাদেরের সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন তার স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের, ভাই আবদুল কাদের মির্জা, ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ও নোয়াখালীর সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরী।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সড়কে চলাচলের জন্য ১৩৭টি বাস কেনার কথা থাকলেও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণ দেখিয়ে ওবায়দুল কাদের তার ক্ষমতার সময়ে দেড় বছর ধরে আটকে রাখে প্রক্রিয়াটি। সূত্রের দাবি, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরীর পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ না পাওয়ায় বাস ক্রয়ের প্রক্রিয়াটি আটকে যায়।

বিআরটি কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, বাস ক্রয়ের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৫ কোটি টাকা। বাস কেনার জন্য প্রথম দরপত্রে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দ্বিতীয় দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। প্রথম দরপত্রে বাসগুলো কেনার জন্য সর্বনিম্ন দর ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার (১৮৮ কোটি টাকা)। দ্বিতীয় দরপত্রে সর্বনিম্ন দর ছিল প্রায় ১ কোটি ৯১ লাখ ডলার (২০৩ কোটি টাকা)। তৃতীয় দরপত্রে সর্বনিম্ন দর পড়ে প্রায় ৩ কোটি ডলার (৩৬০ কোটি টাকা)।

প্রথম দরপত্রে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও বলা হয়, কার্যকর প্রতিযোগিতা হয়নি। পরের দরপত্রে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ায় এটা কীভাবে কার্যকর প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর তৃতীয় দরপত্রে খরচ অনেক বাড়ানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, কাদের সিন্ডিকেটের পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি বলেই বারবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি ওই প্রকল্প।

ওবায়দুল কাদের ও তার স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের এবং কাদেরের দুই ভাই আবদুল কাদের মির্জা ও শাহাদাত কাদের মির্জার বিরুদ্ধে গত ১৪ অক্টোবর সুলতান মাহমুদ নামে এক আইনজীবী দুদকে দুর্নীতির অনুসন্ধানের আবেদন করেন। দুদক আইন ২০০৪-এর ২৭ ধারায় দুদককে মামলা করার আহ্বান জানান ওই আইনজীবী।

আবেদনে বলা হয়, ওবায়দুল কাদের (সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী) ক্ষমতার অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন এবং তার ভাই আবদুল কাদের মির্জা ও শাহাদাৎ কাদের মির্জা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জন করেছেন। যা দেশে ও বিদেশে বিদ্যমান আছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত এসব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানাচ্ছি। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ওবায়দুল কাদেরের পেশা ছিল লেখালেখি ও সাংবাদিকতা। ১৬ বছর পরে সেই পেশা পরিবর্তন করে কাগজে-কলমে তিনি ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ সেজেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনি হলফনামায় সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্ত সম্মানী, লেখালেখি, বাড়িভাড়া, ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্র বিবেচনায় ২০০৮ এর তুলনায় কাদেরের স্থাবর সম্পদ বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি। ওই সময়ে তার অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ১৩ গুণের বেশি।

কাগজে-কলমে ২০০৮ সালে ওবায়দুল কাদেরের অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ২৪ লাখ ৪৮ হাজার ৯৫ টাকার। তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ৪৮ লাখ ৮১ হাজার ৫২২ টাকার। ১৬ বছর পর কাদেরের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯৮ টাকা এবং তার স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদেরের সম্পদের পরিমাণ হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৪২ হাজার ৪৬৪ টাকা। সবশেষ মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ওবায়দুল কাদেরের বার্ষিক আয় দেখানো হয় ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়া থেকে ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৯২৪ টাকা; শেয়ার, সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানত থেকে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ২৮৪ টাকা। এমপি ও মন্ত্রী হিসেবে বেতন-ভাতা বাবদ ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা আয় দেখানো হয়। এ ছাড়া বই থেকে আয় ৪ লাখ ২৫ হাজার ৩০০ টাকা, তার ওপর নির্ভরশীলদের আয় ১২ লাখ ২৩ হাজার ৫১২ টাকা দেখানো হয়। বর্তমানে ওবায়দুল কাদেরের ব্যাংক হিসাবে জমার পরিমাণ প্রায় ৭৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। আর তার স্ত্রীর নামে ব্যাংকে জমা আছে ৫১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

হলফনামায় ওবায়দুল কাদেরের নিজের কাছে নগদ ৮০ হাজার ও স্ত্রীর কাছে ৭০ হাজার টাকা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। ১৬ বছর আগে ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ছিল ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। স্ত্রীর বিনিয়োগ ছিল ৪২ লাখ টাকা। বর্তমানে তার সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে বিনিয়োগ ৭৩ লাখ টাকা। ১৬ বছর আগে ওবায়দুল কাদেরের নিজের কোনো গাড়ি ছিল না। বর্তমানে তার ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে।

ওবায়দুল কাদেরের স্থায়ী সম্পদের মধ্যে রয়েছে উত্তরায় একটি পাঁচ কাঠার প্লট। স্ত্রীর নামে ১ হাজার ৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। এ ছাড়া যৌথ মালিকানায় (পৈতৃক সম্পত্তি) ৪ দশমিক ৭৪ একর কৃষি জমি আছে।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায় হলফ নামায় সম্পদের চেয়ে ওবায়দুল কাদেরের সম্পদ কয়েক হাজার গুণ বেশি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুরে এবং ব্যাংককে ওবায়দুল কাদেরের হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। সিঙ্গাপুরে ব্যয় বহুল অরচার্ড রোডে কাদেরের রয়েছে তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট। তার স্ত্রীর নামে সিঙ্গাপুরের কিচেনারীতে আছে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট। এ ছাড়াও সিঙ্গাপুরে বেনামে কাদের গড়েছেন একটি মানি একচেঞ্জ এবং ট্রাভেল এজেন্সি। ব্যাংককে ওবায়দুল কাদেরের নামে একটি হোটেলের শেয়ার রয়েছে। কাদেরের ছোট ভাই মির্জার রয়েছে নিউইয়র্কে বিলাস বহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং পেট্রোলপাম্প। ওবায়দুল কাদেরের বিপুল টাকা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছেন নিজাম হাজারী। এখন ওবায়দুল কাদের কলকাতায়। সেখানে নিজাম হাজারীই কাদেরের যাবতীয় দেখভাল করছেন।

সূত্র- নিউজ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category