• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
ভাঙ্গুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৫ টি ঘর বিক্রির ও পরিত্যক্ত ঘরে জুয়া-মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বাউরা পূনম চাঁদ ভুতোরিয়া কলেজে আন্তঃবিভাগ বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও পুরুষ্কার বিতরন প্রবাসীদের দুয়ারে বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রবাসীদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার এক ম্যাচ বাকি থাকতে ব্রাজিল শিবিরে আতঙ্ক, নকআউট পর্বের শুরুতেই কঠিন প্রতিপক্ষ! বাংলাদেশের সন্নিকটে ৩ নতুন বিমানবন্দর তৈরি করবে ভারত সংসদের সবাইকে ১০ কেজি করে আম উপহার দিলেন জামায়াত আমির ভারতে কোচিং সেন্টারে আগুন, নিহত ১৫ কামড় দেওয়া সাপ নিয়ে হসপিটালে যুবক বিদেশি পর্যটককে হেনস্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ‘হিরো নানা’ গ্রেপ্তার ডিসি সারওয়ারকে খোলা চিঠি, মাজারের বিরুদ্ধে অজানা তথ্য ফাঁস

দশ বছরে ৭ প্রধানমন্ত্রী, কেন এই অস্থিরতা ব্রিটেনে?

অনলাইন ডেস্ক | / ২০ Time View
Update : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

প্রায় দুই বছর আগে বড় জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি। দলটির নেতা কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। দলের ভেতরে বিদ্রোহ ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। একই সঙ্গে বাড়ছিল চাপ। এমন পরিস্থিতিতে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।সোমবার এক আবেগঘন বক্তব্যে স্টারমার জানান, নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন। নতুন নেতা নির্বাচিত হলেই তিনি হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

নেতৃত্ব নির্বাচন শুরু হবে ৯ জুলাই। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগেই এই প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে স্থানীয় নির্বাচনে খারাপ ফল করে লেবার পার্টি। এতে স্টারমারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বড় জয় পান অ্যান্ডি বার্নহাম। এই জয়ই স্টারমারের জন্য চূড়ান্ত ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। এর পরপরই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে জটিল বিচ্ছেদসবকিছুর শুরু সম্ভবত ব্রেক্সিট থেকে। ২০১৬ সালের বিতর্কিত গণভোটে ব্রিটিশ ভোটাররা অল্প ব্যবধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়, যার প্রভাব এখনও অব্যাহত রয়েছে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ছয় বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল। ২০১৫ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় ক্যামেরন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুনর্নির্বাচিত হলে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ নিয়ে গণভোট আয়োজন করবেন।

কনজারভেটিভরা নির্বাচনে জয়ী হয় এবং ক্যামেরন ডাউনিং স্ট্রিটে থেকে যান। কিন্তু গণভোট তার প্রত্যাশামতো হয়নি। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকার পক্ষে ‘রিমেইন’ শিবিরে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। নির্বাচনে জয় পেলেও গণভোটে তার সমর্থিত ‘রিমেইন’ শিবির পরাজিত হয়।গণভোটের ফল প্রকাশের পর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

ব্রেক্সিট কনজারভেটিভ পার্টির রাজনৈতিক ভিত্তিতেও বড় পরিবর্তন আনে। দীর্ঘদিনের অনেক সমর্থক ব্যবসাবান্ধব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে জনতাবাদী ও ব্রেক্সিটপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন।একই সময়ে কনজারভেটিভদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের অনেক সমর্থক ব্রেক্সিট আন্দোলনকে সমর্থন করেন।

চাপ বাড়ছিল স্টারমারের ওপর

দীর্ঘদিনের বিরোধী দল লেবার পার্টি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে বড় জয় পায়। দলটির নেতা কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার সরকার নানা চাপে পড়ে।

অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন এবং স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছে লেবার সরকার।স্টারমারের সরকার বিভিন্ন বিতর্কেও জড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে বিতর্ক। দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধু ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন স্টারমার। এ বিষয়ে তিনি কী জানতেন, কখন জানতেন এবং কী জানতেন না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচনের ফলই স্টারমারের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক পার্লামেন্টের আসনের নির্বাচনে লেবার পার্টি খারাপ ফল করেছে। জনমতের সূচক হিসেবে বিবেচিত এসব নির্বাচন অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো।

লেবার পার্টির সাম্প্রতিক খারাপ নির্বাচনি ফলের কারণে দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক পদত্যাগ করেছেন এবং কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

শুরুতে স্টারমার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে লেবার পার্টির অন্তত দুজন প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী স্পষ্ট করে জানান, তারা দলীয় নেতৃত্বের জন্য তাকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন। আর পার্লামেন্টে যে দলের আসন সবচেয়ে বেশি থাকবে, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হবেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত লেবার পার্টিই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে থাকবে।এদিকে ব্রেক্সিটের অন্যতম রূপকার এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র নাইজেল ফারাজ এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়েছেন।

দুই প্রধান দলই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা ভোটারদের সামনে নিজেকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। তার দল রিফর্ম ইউকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এর মাধ্যমে দলটি ব্রিটিশ রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে মূলধারার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক দশকে ব্রিটেনে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনা দেশটির ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক আনুগত্য এবং কার্যত দুই-দলীয় ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত বহন করে। এই পরিস্থিতিতে জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে নাইজেল ফারাজ ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির আরও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসতে পারেন।

জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান মোর ইন কমনের যুক্তরাজ্য পরিচালক লুক ট্রাইল বলেন, ‘২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচন মূলত পরিবর্তনের পক্ষে ভোট ছিল। মানুষ বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো ও ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি। আর এ কারণেই রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত আছে।’

গত ১০ বছরে কারা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী?

২০১৬ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। গড়ে প্রতি দেড় থেকে দুই বছর পরপরই নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে।

ডেভিড ক্যামেরন ২০১৬ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি ব্রেক্সিট ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ছিলেন। তবে গণভোটে পরাজিত হন। থেরেসা মে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে ব্যর্থ হন তিনি। বরিস জনসন ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। একাধিক কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক চাপ তাকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। লিজ ট্রাস ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ঋষি সুনাক ২০২৪ সালে ক্ষমতা ছাড়েন। সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।

সবশেষে পদত্যাগ করলেন কিয়ার স্টারমার।

দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রবার্ট ওয়ালপোল। তিনি ১৭২১ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। আধুনিক সময়ে মার্গারেট থ্যাচার ১১ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। টনি ব্লেয়ার ছিলেন প্রায় ১০ বছর। সবচেয়ে কম সময় দায়িত্বে ছিলেন লিজ ট্রাস। তার মেয়াদ ছিল মাত্র ৪৯ দিন।

এখন কী হবে?

অ্যান্ডি বার্নহাম বর্তমানে এগিয়ে রয়েছেন। তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া ওয়েস স্ট্রিটিংও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারেন। প্রার্থী হতে হলে ৮১ জন লেবার পার্টির সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। এরপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচন হতে পারে। তবে সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নির্বাচিত হয়

যুক্তরাজ্যের ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। বরং ভোটাররা নিজেদের নির্বাচনি এলাকার প্রতিনিধিত্বের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের সদস্য নির্বাচন করেন। সাধারণত যে দলের নেতা হাউস অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।

রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে যেকোনো সময় তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে, এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও। যদি তিনি দলের পর্যাপ্ত সদস্যের আস্থা হারান, তবে তাকে সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কোনো দলীয় নেতা পদত্যাগ করলে বা পদচ্যুত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদও হারান।

এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বদলানো সম্ভব। তবে ক্ষমতাসীন দল নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে। যুক্তরাজ্যের আইনে সর্বোচ্চ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ক্ষমতাসীন সরকার চাইলে তার আগেও নির্বাচন দিতে পারে।

সাধারণত কোনো সরকার যদি মনে করে সংসদে আরও বেশি আসন জিতে নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে পারবে, অথবা জনসমর্থন কমে যাওয়ার চাপ থেকে আগাম নির্বাচন আয়োজন করা হয়।

গত এক দশকে এমন ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। ফলে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সূত্র: সিবিসি নিউজ, আল-জাজিরা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category