ওয়াশিংটন থেকে সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী ওয়েসলিয়ান মিডিয়া প্রজেক্ট জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এআইয়ের ব্যবহার বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ওয়াশিংটন থেকে সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী ওয়েসলিয়ান মিডিয়া প্রজেক্ট জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এআইয়ের ব্যবহার বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
এআই বিজ্ঞাপনে প্রার্থীদের নিয়ে অপপ্রচার
শনাক্ত হওয়া বিজ্ঞাপনগুলোর কয়েকটি বেশ উসকানিমূলক। একটি ভিডিওতে রিপাবলিকান দলের এক গভর্নর পদপ্রার্থীকে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, ‘ক্লিনটনের ভক্ত, ট্রাম্পের বিরোধী’—এমন বার্তা।
আরেকটি বিজ্ঞাপনে ডেমোক্রেটিক দলের সিনেট পদপ্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘৯/১১ উদযাপন করো’ লেখা কার্ড দেখে হাসতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে ফ্লোরিডার গভর্নর পদে রিপাবলিকান দলের প্রাথমিক নির্বাচনের প্রার্থী জেমস ফিশব্যাককে ইরানি নেতাদের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে দেখানো হয়। সেখানে ডেভিডের তারকা প্রতীকে আক্রমণের দৃশ্যও যুক্ত করা হয়েছে।
এসব ভিডিওর মাধ্যমে প্রার্থীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।
ফেসবুকের সাবেক ডেটা প্রকৌশলী ও তথ্য ফাঁসকারী ফ্রান্সেস হাউগেন বলেন, এখন খুব কম খরচেই এমন মানের তথ্যপ্রভাব বিস্তারের অভিযান চালানো সম্ভব, যা ২০১৬ সালে কল্পনাও করা যেত না।
তিনি বলেন, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের নিয়ম এড়িয়ে অপতথ্য ছড়ানোও সহজ হয়েছে। কারণ, প্রতিবার পোস্ট তৈরির সময় সামান্য পরিবর্তন আনলেই একই ধরনের কনটেন্টের নতুন সংস্করণ তৈরি করা যায়। ফলে কিছু পোস্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভোটারদের তথ্য পাওয়ার নতুন মাধ্যম এআই
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব পলিটিক্যাল কনসালট্যান্টস ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১ শতাংশ উত্তরদাতা নির্বাচনী তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে এআইকে মনে করেন। তবে প্রতি পাঁচজন ভোটারের একজন জানিয়েছেন, ব্যালটে থাকা কোনো নির্বাচন বা প্রার্থী সম্পর্কে জানতে তাঁরা এআই ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন।
জরিপে আরও দেখা গেছে, এর দ্বিগুণসংখ্যক ভোটার ইতোমধ্যে এআইয়ের তৈরি সার্চ-সারাংশ থেকে নির্বাচনী তথ্য পেয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে এআই চ্যাটবটগুলো প্রার্থী ও রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ এবং প্রভাবিত করার পরামর্শ দিয়ে নতুন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে।
বামপন্থী অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘রান ফর সামথিং’ চালু করেছে ‘ক্যাম্পসাইট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। এটি বিভিন্ন বিষয় ও প্রার্থী সম্পর্কে বৃহৎ ভাষা মডেলগুলো কী বলছে, তা পর্যবেক্ষণ করে এবং এসব বর্ণনা কীভাবে প্রভাবিত করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেয়।
অন্যদিকে, ডানপন্থী সংগঠন ‘সেন্টার ফর ক্যাম্পেইন ইনোভেশন’ প্রার্থীদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এআই মডেলগুলো কীভাবে উত্তর দেয় এবং কোন উৎসগুলো বেশি উদ্ধৃত করে, তা নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেছে।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক এরিক উইলসন দ্য আটলান্টিককে বলেন, এখন এআইয়ের ভোটের জন্যও প্রচার চালানো হচ্ছে।
এআই নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে প্রযুক্তি কোম্পানির তদবির
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এআই খাতের বড় কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক তদবিরেও বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। তাদের লক্ষ্য, এআই প্রযুক্তির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ঠেকানো এবং নীতিনির্ধারণে শিল্প খাতের অবস্থান শক্তিশালী করা।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে এবং নির্বাচনে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) ও বিভিন্ন অধিকারভিত্তিক সংগঠনের নেটওয়ার্কে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে।
এ উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘লিডিং দ্য ফিউচার’ নামের একটি সুপার পিএসি। ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান আন্দ্রেসেন হোরোভিটজ এ সংগঠনকে সমর্থন দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির অ্যাসেম্বলিম্যান অ্যালেক্স বোরসকে কংগ্রেসের প্রাথমিক নির্বাচনে পরাজিত করতে সংগঠনটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। এআই নিরাপত্তা বিল ‘রেইজ অ্যাক্ট’ উত্থাপনের কারণে তাঁকে লক্ষ্য করে এ প্রচারণা চালানো হয়।
এদিকে, অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এআই-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন সীমিত করার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর বাজেট সমন্বয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অঙ্গরাজ্যগুলোর এআই আইন প্রণয়নের ওপর স্থগিতাদেশের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সিনেটে তা প্রত্যাখ্যাত হয়।
গত ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে অঙ্গরাজ্যগুলোর এআই-সংক্রান্ত কিছু আইন চ্যালেঞ্জ করার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলা হয়। পাশাপাশি কঠোর এআই বিধিনিষেধ আরোপকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্রডব্যান্ড তহবিল আটকে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে বাণিজ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে শঙ্কা
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এআই ব্যবহারের বিষয়টি গোপন রেখে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন ভোটারদের সামনে মিথ্যা বাস্তবতা তুলে ধরতে পারে। এতে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে উঠবে এবং প্রার্থীদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সুসান হাইড বলেন, ভোটাররা তাঁদের কাছে পৌঁছানো তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে না পারলে কীভাবে অবহিত সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে হলে নাগরিকদের নিজেদের পছন্দ সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে রাজনীতিকেরা প্রচারণার মাধ্যমে কত সহজে সমর্থকদের কাছে মিথ্যা তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসও সতর্ক করেছে, এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বচ্ছতা ও মানবিক তদারকি এগোচ্ছে না। সংস্থাটির গবেষণায় বলা হয়েছে, চ্যাটবটের সহায়তায় সহজেই তৈরি করা ডিপফেক নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টাকারীদের জন্য শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও গ্রকের মতো এআই চ্যাটবটকে নির্বাচনী ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ছবি তৈরির অনুরোধ জানানো হলে তারা সব ক্ষেত্রে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি। এসব ছবিতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ব্যালট বাক্সে জাল ব্যালট ঢোকানো কিংবা বিপুলসংখ্যক অ-মার্কিন নাগরিকের ভোট দেওয়ার মতো মিথ্যা দৃশ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্রেনান সেন্টার বলেছে, ভোটের সময় মানুষ যে তথ্যের ওপর নির্ভর করে এবং যে ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালিত হয়, তার ওপর আস্থা না থাকলে অর্থবহ বিতর্ক ও ন্যায্য নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। এআইয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী অপতথ্য তৈরি ও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।