• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১১ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
তাহসিফের বাবার বক্তব্যে মিললো চাঞ্চল্যকর তথ্য ডিভি লটারি নিয়ে এলো নতুন সিদ্ধান্ত জাপানের সঙ্গে বিকল্প অর্থায়নে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, হানিফের অর্ধেক সম্পত্তি জুলাই যোদ্ধাদের দেওয়ার নির্দেশ একযোগে ২৮ পুলিশ সদস্য ক্লোজড বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে থাইল্যান্ডকে দুই প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ ইসরায়েলের নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, কত আসন পেল নেতানিয়াহুর দল? ভালুকায় ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার প্রকল্প উদ্বোধন করলেন জ্বালানিমন্ত্রী এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ল, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের তাগিদ ব্যবসায়ীদের পাবনায় বজ্রপাতে ৬ জনের মৃত্যু

পুরোনো সিনেমা হলের কোর্টে শুরু, জাতীয় ব্যাডমিন্টনের শিরোপা জিতলেন লিকা পোদ্দার

পার্শা বিনতে শরীফ, যবিপ্রবি প্রতিনিধি / ৩৪ Time View
Update : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

 

নদীতে মাছ ধরে চলে চার সদস্যের সংসার। সীমিত আয়ের সেই পরিবারের মেয়েই এখন জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার দীর্ঘদিনের সাধনা, আর্থিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অর্জন করেছেন ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককের শিরোপা।

জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ-ছয় বছরের লড়াই শেষে জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপা জয়ের পর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন ২৪ বছর বয়সী এই শাটলার। মোংলায় থাকা মাকে ভিডিও কল করে নিজের সাফল্যের কথা জানান লিকা। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া লিকা নারী এককের ফাইনালে মুখোমুখি হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন উর্মি আক্তারের। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে উর্মিকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করেন তিনি। পাঁচ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এই খেলোয়াড়।

তবে লিকার এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। মোংলায় বেড়ে ওঠা লিকার বাবা পেশায় মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে উপার্জিত অর্থেই চলে পরিবারের ভরণপোষণ। এমন বাস্তবতায় খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। আর্থিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে। তবু নিজের লক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াননি লিকা।

২০১৯ সালে মোংলায় ব্যাডমিন্টন খেলার মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু। প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের তত্ত্বাবধানে একটি পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তৈরি কোর্টে তিন থেকে চার বছর অনুশীলন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে দিনাজপুরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) একাডেমিতে নেওয়া হয়। সেখানে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া এলোরা শাটলিন অ্যাকাডেমি, কাওসাকি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ এবং কোচের সহযোগিতা তাঁর এগিয়ে চলার পথকে সহজ করেছে।

জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে লিকা বলেন, “আমার এই যাত্রা অনেক দিনের। গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে খেলছি। শুরু থেকেই আমার একটা লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। অবশেষে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের ও গর্বের।”

এবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ছেলেদের বিভাগে ৫১২ জন এবং মেয়েদের বিভাগে ৮৩ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। নকআউট পদ্ধতির প্রতিযোগিতায় একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছানো এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা অর্জনকে নিজের ক্যারিয়ারের বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন লিকা।

জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে লিকাকে। ক্লাস, পরীক্ষা ও নিয়মিত অনুশীলন—সবকিছু সামলে এগিয়ে চলা তাঁর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন তিনি।

লিকার ভাষ্য, খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনেক সময় এলাকার মানুষের নানা মন্তব্য শুনতে হয়। শুধু খেলোয়াড় নয়, তাঁদের পরিবারকেও এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তবে তাঁর মা-বাবা সব সময় পাশে ছিলেন। মেয়েকে দেশের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখার স্বপ্ন ছিল তাঁদেরও। পরিবারের এই সমর্থনই তাঁকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

নিজের সাফল্যের পেছনে প্রথম কোচের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন লিকা। তিনি বলেন, মিলন সর্দার জুস সব সময় চেষ্টা করেছেন, যাতে তিনি ভালো করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান। পরিবারের সমর্থন, কোচের দিকনির্দেশনা ও নিজের পরিশ্রমের সমন্বয়েই দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াসুবিধা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিকা বলেন, যবিপ্রবিতে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে ভালো অবস্থান ধরে রাখতে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কোচের সংকট অনুভব করেন তিনি।

লিকার মতে, কাফি স্যারের বাইরে আরও দক্ষ কোচের প্রয়োজন রয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়েরা নিজেদের দক্ষতা আরও বাড়াতে পারবেন এবং জাতীয় পর্যায়ে ভালো ফল অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ সামলাতে হয়। ফলে অনেক সময় পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। খেলোয়াড়দের বাস্তবতা বিবেচনায় উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা থাকলে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দেশে লিকা বলেন, খেলাধুলায় সাফল্য পেতে হলে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন, নিয়মিত অনুশীলন, কোচের নির্দেশনা অনুসরণ এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকা জরুরি। এক দিনে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সময়, ধৈর্য ও পরিশ্রম।

তাঁর মতে, খেলাধুলার মাধ্যমে পরিচিতি ও সম্মান অর্জনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। তাই যারা খেলাধুলায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের আন্তরিকতা নিয়ে শুরু করে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

লিকার এই অর্জনে গর্ব প্রকাশ করেছে যবিপ্রবি প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা দপ্তরের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. অভিনু কিবরিয়া বলেন, “লিকা পোদ্দারের এই সাফল্যে আমরা অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা চালিয়ে এসে তার চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমরা আশাবাদী, ভবিষ্যতেও সে আরও সাফল্য অর্জন করবে। তার জন্য আমাদের আন্তরিক শুভকামনা রইল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কে তিনি বলেন, সম্প্রতি ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় শিক্ষার্থীরা ভালো পারফরম্যান্স করছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ও কোচদের প্রচেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠার ফলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়েরা ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারছেন।

তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও স্বীকার করেন ড. অভিনু কিবরিয়া। তিনি বলেন, সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষার্থীদের ভালো করার ক্ষেত্রে তাঁদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। ভবিষ্যতে খেলাধুলায় আরও ভালো ফল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাফল্য বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

জাতীয় শিরোপা জয়ের পর লিকার সামনে এখন সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে চান তিনি। নদীতে মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার মেয়ের এই অর্জন কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের পারিবারিক সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি।

মোংলার একটি পুরোনো কোর্টে শুরু হওয়া লিকার যাত্রা আজ জাতীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুটে পৌঁছেছে। এবার তাঁর স্বপ্ন আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টনের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে ধরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category