বাংলাদেশের মানুষকে অর্থনৈতিক ও গনতান্ত্রিক মুক্তির আলো দেখিয়ে ১৯৪৭ সালে,১৯৫২ সালে,১৯৭১ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু মুক্তি মেলে নি, বরং পরাধীনতার শৃংখল আমাদের গলায় পড়ানোই আছে, সকল বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে, সুবিধা ভুগীরা মানুষকে বোকা বানিয়ে বিপ্লব গুলোর সুফল পকেটে পুরিয়েছে।
সর্বশেষ ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবেরও একই অবস্থা হচ্ছে। রাজনৈতিক দল গুলো বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবের নামে জনগনের সামনে গনতন্ত্রের মূলা ঝুলিয়েছে, কিন্তু আসল জায়গায় সংস্কারের বিষয়ে সব গুলো রাজনৈতিক দল জোট বদ্ধ ভাবে চুপ থেকে ১৮ কোটি জনগনের সাথে সচেতন ভাবে প্রতারনা করছে। আর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই মুক্তি ও সংস্কারের এই মূল জায়গাটির বিষয়ে অবগত না থাকার কারনে চুপ রয়েছে, আর অপর দিকে রাজনৈতিক দস্যুরা আসল জায়গায় হাত না দিয়ে সংস্কারের ভাওতাবাজী করছে। সেই জায়গাটি কি? সে জায়গাটির নাম হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছদ বা Artical 70।
আসুন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কি জানা যাক।
সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদে কি আছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখে।
এ অনুচ্ছেদের ইতিহাসঃ
৭০ নং অনুচ্ছেদটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কর্তৃক প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ ১৯৭২’-এর ফলস্বরূপ সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল।রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শে আদেশটি জারি করেন। শেখ মুজিবুর রহমান বিচলিত হয়েছিলেন যখন তাঁর নিজ দলের একজন আইনপ্রণেতা কে এম ওবায়েদুর রহমান একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যে কেন গণপরিষদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। ১৯৭২ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের অধীনে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাহী শাখার কাছে ছিল।
অনুচ্ছেদ ৭০(Artical 70):
সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭০-এ বলা হয়েছে:
৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন,
(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,
তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।
প্রয়োগঃ
অনুচ্ছেদটি অবাধ ভোট প্রতিরোধ এবং সংসদ সদস্যদের দল পরিবর্তন করতে প্রভাব ফেলে। সংসদ সদস্যরা তাঁদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের সংসদীয় আসন হারায়। অনুচ্ছেদ নং ৭০-এর ফলে বাংলাদেশের সংসদ মূলত ক্ষমতাসীন দল বা জোটের গৃহীত পদক্ষেপের জন্য পুতুল সংসদ হিসাবে কাজ করছে। সংসদও প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের জন্য অনাস্থা ভোট দিতে অক্ষম।
অনুচ্ছেদটি যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার আইনসভার মতো ওয়েস্টমিন্স্টার সিস্টেমের পাশাপাশি অন্যান্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেমন মার্কিন কংগ্রেস এবং জাপানিজ ডায়েটের নিয়মের বিপরীত।
সমালোচকদের যুক্তি ৭০নং অনুচ্ছেদ বাকস্বাধীনতা এবং বিবেকের স্বাধীনতাসহ সংবিধানের মৌলিক অধিকারের বিরোধী। সংসদে জবাবদিহিতার অভাব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অবাধ ক্ষমতা দেয়, যিনি প্রায়ই একনায়কতন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। অনাস্থা প্রস্তাবের বিকল্প ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত, কারণ এমন কিছু প্রতিকার রয়েছে যার মাধ্যমে একজন প্রধানমন্ত্রীকে আইনত বরখাস্ত করা যেতে পারে।
সংস্কারের প্রস্তাবঃ
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, নাগরিক অধিকার কর্মী এবং সংসদ সদস্যরা ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করার দাবি জানায়। ১৭ এপ্রিল ২০১৭ সালে অনুচ্ছেদটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। কিন্তু উচ্চ আদালত তা খারিজ করে দেয়।২৩ অক্টোবর ২০২৪ সালে উক্ত অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবার হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।১৭ জুন ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা গঠিত জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন জানায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারে সম্মত হয়েছে।
বিতর্কঃ
৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সরকারের বা প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর আইনসভা বা জাতীয় সংসদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। জাতীয় সংসদে সদস্যগণ বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারেন কিন্তু দিন শেষে সরকারের পক্ষেই মত দিতে হয়। এরফলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সদস্যগণ কিছু করতে পারে না।
আমাদের করণীয়:
বাংলাদেশের মানুষের বর্তমানে সকল সংস্কার বাদ দিয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত, না হলে এদেশে প্রকৃত গনতন্ত্র আসবে না, গণমানুষের মুক্তি মিলবে না।
যদিও রাজনৈতিক দল গুলো বলছে আর্টিকেল ৭০ বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছেছে তথাপিও এই অনুচ্ছেদ বাতিল করার পক্ষে ঐক্যমতে পৌঁছেছে না রেখে দিয়ে জাতিকে গনতান্ত্রিক গোলামির জালে আটকে রাখার ঐক্যমতে পৌঁছেছে তা এখনো পরিস্কার নয় আজও।
আর্টিক্যাল ৭০ বাতিল হোক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক।