হে বিবেক সম্পন্ন মানব সমাজ, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের যাঁতাকল এখনও চলছে, এবং এর অগ্নিশিখা এখনও আমাদের উপসাগর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। থেমে নেই যুদ্ধের লেলিহান দাবালন। তবুও আমরা অনুভব করি, আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহের উপস্থিতি আমাদের ঘিরে রেখেছে এবং তাঁর সতর্ক দৃষ্টি আমাদের রক্ষা করছে। পাঁচ সপ্তাহ ধরে আমরা এই যুদ্ধ, এর অগ্নিশিখা, এর ভয়াবহতা এবং এর ক্ষতি সহ্য করেছি এবং করে যাচ্ছি। এই দৃঢ়তা, নিশ্চয়তা এবং অটল বিশ্বাস নিয়ে যে, আমরা আল্লাহর তত্ত্বাবধানে, সুরক্ষায় এবং পর্যাপ্ততার মধ্যে আছি এবং তিনি সবকিছু করুণায় আচ্ছাদিত করবেন। অন্যরা যাকে আমাদের জন্য মন্দ বলে মনে করে, আমরা আল্লাহর অনুগ্রহে তাকে ভালো হিসেবে দেখি। আমরা আত্মবিশ্বাস ও নিশ্চয়তার সাথে আল্লাহর সুস্পষ্ট গ্রন্থে তাঁর বাণী ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি করি: ‘‘একে তোমাদের জন্য মন্দ মনে করো না; বরং এটি তোমাদের জন্য ভালো।’’
এই যুদ্ধ, এবং তার সমস্ত রূপান্তর, ঘটনাপ্রবাহ, বিকাশ, অবস্থান, ওঠানামা, মতামত এবং উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঠিকতা এবং আমাদের অবস্থানের বৈধতার প্রতি আমাদের আক্বীদা বিশ্বাসকে কেবল আরও শক্তিশালী করেছে: তবে দুর্বল অন্তঅভ্যন্তরে মানুষগুলো এখানে পথ হারা বা দিশে হারা হয়ে গেছে। এই উন্মত্ত যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়। এতে আমাদের কোনো স্বার্থ নেই, এতে আমাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই, এবং আমরা এর কোনো পক্ষ নই। বরং, এটি দুটি অত্যাচারী ও অপরাধী শত্রুর মধ্যকার যুদ্ধ, যারা গতকালও মিত্র ছিল এবং এখন যুদ্ধে লিপ্ত। তারা বিকৃত ধর্মীয় উদ্দেশ্য এবং মনগড়া মতবাদের দ্বারা চালিত হয়ে থাকে, প্রত্যেকেরই রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাএবং আধিপত্য বিস্তার করা। প্রত্যেকেরই অপরাধ ও পাপে পরিপূর্ণ একটি ইতিহাস রয়েছে যা মানব সভ্যতার রক্তে রঞ্জিত।
হে আল্লাহর বান্দাগণ, আমরা বিশ্বাস করি যে, যুগে যুগে আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত বা রীতি হলো, তিনি তাঁর নির্যাতিত বান্দাদের প্রতিশোধ নেন, অত্যাচারীদের দ্বারা অত্যাচারীদের বিনাশ করার মাধ্যমে, এবং সময়ের আবর্তে আমরা এরই সাক্ষী হয়েছি। ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিনে নির্যাতিতদের জন্য এই যুদ্ধে আমরা তাঁর প্রতিশোধ দেখেছি। মহান আল্লাহ তাআলা সত্যবাদী যখন তিনি বলেন: ‘‘এবং কখনো ভেবো না যে, অন্যায়কারীরা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ অমনোযোগী বা উদাসীন।’’ আমরা দেখেছি কীভাবে আল্লাহ তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন এবং তাদের একে অপরের শক্তির স্বাদ আস্বাদন করিয়েছেন। আমরা তাদের এ দু পক্ষের কাউকে নৈতিক কারণে সমর্থন করি না। আমরা জায়নবাদী-মার্কিন আগ্রাসনের দ্বারা হাজার হাজার ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেছি, যার মধ্যে ছিল সামরিক স্থাপনা, বিমান ও নৌবাহিনী, বিমান-বিধ্বংসী কামান, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা, ড্রোন, অবকাঠামো, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি মহাবিদ্যালয়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর পাশাপাশি ইরানি নেতৃত্বের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের গুপ্তহত্যাও আমরা দেখেছি।
বিপরীতে, আমরা দেখেছি ইরানি শত্রুরা আয়রন ডোম ধ্বংস করেছে এবং ইসরায়েলি শহর, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, তেল শোধনাগার ও সমুদ্রবন্দরে সরাসরি আঘাত হেনেছে। আমরা তাদের সকলকে কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করতে দেখেছি। এভাবেই আমরা কিছু অত্যাচারীকে তাদের উপার্জনের বা কৃতকর্মের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে দেখেছি। এর উপরে মহান আল্লাহর হাত ছাড়া আর কোনো হাত নেই, এবং কোনো অত্যাচারীই তার চেয়েও বড় অত্যাচারীর দ্বারা পীড়িত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে না।
আমাদের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা:
যদিও আমরা উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধ প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম, এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমাদের এই ঘোষণায় কঠোরভাবে অটল ছিলাম যে, আমরা আমাদের ভূখণ্ড থেকে কোনো আক্রমণ হতে দেব না, তবুও বিশ্বাসঘাতকতার হাত আমাদের দিকে প্রসারিত হলো এবং আমাদের উপর তার গোলাবর্ষণ শুরু করল। ইরানি শত্রু একটি দুর্বল অজুহাত এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ধ্বংসাত্মক ড্রোন দিয়ে আমাদের উপর বোমাবর্ষণ করেছিল।
তবে, যা আমাদের অবাক করেছিল, এবং যা আমরা আমাদের কঠিন পরীক্ষার মধ্যেও বিপদ পরিবেষ্টিত থাকা অবস্থায় প্রত্যাশা বা আশা করিনি, তা হলো আমাদের কিছু ভাইকে খুঁজে পাওয়া, যারা ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবি করে, অথচ তারা আমাদের শত্রুর প্রতি একটি পক্ষপাতমূলক অবস্থান গ্রহণ করছে। এর উৎস ছিল একটি পদ্ধতিগত ত্রুটি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি এবং নৈতিক স্খলন, যার পূর্বে ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর শাসনব্যবস্থার প্রতি একটি বৈরী মনোভাব, যা সবই একটি ধর্মীয় ও আইনগত আবরণে ঢাকা ছিল।
এই পক্ষপাতমূলক অবস্থানটি তিনটি ভ্রান্ত মৌলিক ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত, যা আমি এই নসিহাতে এবং চেতনার উপলব্ধিতে সংক্ষেপে উল্লেখ করব।
প্রথমত:
প্রথম ভুল ধারণাটি হলো, তারা পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিতে ঘটনাগুলো দেখেছে এবং ইরানিদের কাপুরুষোচিত বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছে। তারা তাদের প্রতারণার নিন্দাও করেনি, তাদের বিশ্বাসঘাতকতারও তীব্র প্রতিবাদ জানায়নি। কেউ কেউ তো এই হামলাগুলোকে নিছক পার্শ্ব হামলা হিসেবেই বিবেচনা করে, যা জায়নবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
আক্রমণের শিকার মুসলিম হিসেবে আমাদের এই প্রশ্ন করার অধিকার আছে:
এই লোকেরা কি ইরানি শত্রুদের দ্বারা আমাদের দেশগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ধ্বংসাত্মক ড্রোন হামলাকে—যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের মোট হামলার ৮৫ শতাংশ, এবং যার আগুন এখন আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে—আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে দেখে? তারা কি তাদের এই হামলাগুলোকে আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে দেখে? তারা কি আমাদের ভূমি, নিরাপত্তা, পবিত্র স্থান এবং স্থাপনাগুলোর ওপর তাদের এই লঙ্ঘনকে আমাদের সমর্থন করা এবং আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাদের বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখে? তারা কি আমাদের ভাষ্য এবং আমাদের ভূখণ্ড থেকে কোনো হামলা হতে না দেওয়ার অঙ্গীকারে বিশ্বাস করে, নাকি তারা ইরানি ভাষ্যে বিশ্বাস করে, যেখানে তারা তাদের আগ্রাসনকে এই বলে ন্যায্যতা দেয় যে, তারা কেবল আত্মরক্ষার জন্য আমেরিকান ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যেখান থেকে তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করে? তারা কি এসব গুলোকে তাদের মনগড়া দাবি হিসেবে বিবেচনা করে?
আমাদের অত্যাবশ্যকীয় স্থাপনা, বেসামরিক বিমানবন্দর, জলপথ, সমুদ্রবন্দর এবং বেসামরিক ভবনগুলো কি আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি? আমাদের দুর্বল করা, আমাদের সম্পদ নিঃশেষ করা এবং আমাদের সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রচেষ্টা কি আমাদের পক্ষে, নাকি আমেরিকান বাহিনীর পক্ষে পরিচালিত? সামুদ্রিক জলদস্যুতা, জলপথ ও বেসামরিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু বানানো কি আমাদের দিকে, নাকি আমেরিকান বাহিনীর দিকে পরিচালিত? আমাদের অবকাঠামো, তেলক্ষেত্র এবং গ্যাস স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো কি আমাদের দিকে, নাকি আমেরিকান বাহিনীর দিকে পরিচালিত?
এই অযৌক্তিক অজুহাত যদি সত্যি হতো, তাহলে তারা তুরস্কে অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিটিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি কেন? তারা আজারবাইজানে তাদের সীমান্তের কাছে অবস্থিত ইসরায়েলি ঘাঁটিটিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি কেন? তারা মিথ্যা বলছে, এবং এই অভিজাতরা জানে যে তারা মিথ্যা বলছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তারা তাদের কথা বিশ্বাস করাতে চায়, যদিও তারা নিশ্চিত যে তারা প্রতারণা করছে।
আর এদের থেকেও খারাপ হলো তারা, যারা আমাদেরকে নিকৃষ্টতর বা মর্যাদাহীন উপনিবেশিত জাতি হিসেবে দেখে; যারা মনে করে যে আমাদের ওপর যা ঘটেছে তা তাদের প্রাপ্য এবং যারা এখন সেই একই পাত্র থেকে পান করছে যা তারা অন্যদের পরিবেশন করেছিল। এরা জ্ঞানপাপী, বিদ্বেষী, বিকৃতমনা, ঈর্ষান্বিত, মানসিকভাবে অসুস্থ এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিকারগ্রস্ত লোক। এদেরকে এদের ঔদ্ধত্যের মধ্যে ডুবে থাকতে দেয়া উচিত। এদের জন্য কিছু বলার দরকার আছে এমনটা ম্নেই করি না। বলা হয়, ঈর্ষান্বিতের ঈর্ষার প্রতি ধৈর্য ধরো, কারণ তোমার এই ধৈর্যই তাকে ধ্বংস করবে। আগুন যদি গ্রাস করার মতো আর কিছু না পায়, তবে তা নিজেকেই গ্রাস করে।
দ্বিতীয়ত:
আর দ্বিতীয় যে ভ্রান্তির উপর তারা নির্ভর করে এবং যার আশ্রয় নেয়, তা হলো সেই অন্যায় এবং ভয়াবহ বিকৃত জ্ঞান, তাকফিরি সমীকরণ, যা দিয়ে তারা মুসলিম জাতিকে পরীক্ষা করছে। তারা বর্তমান যুদ্ধটিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র, অর্থাৎ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান, এবং একটি কাফের, শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র, অর্থাৎ জায়নবাদী রাষ্ট্রের মধ্যেকার যুদ্ধ বলে মনে করে। তারা জাতির সামনে তিনটি সম্ভাবনা তুলে ধরে এবং এর মধ্যে একটি বিকল্প নির্ধারণ করে দেয়: এক, ইরান রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানো, এটিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে যার সমর্থন ও পাশে থাকা আবশ্যক, এবং এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে: ‘‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পরের মিত্র।’’ দুই, অথবা, মুসলমানরা জায়নবাদী আগ্রাসনকারীদের সাথে দাঁড়াতে পারে, যার ফলে তারা ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে, মুরতাদ হয়ে যাবে, কারণ তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের পক্ষ নিয়েছে, এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন: ‘‘যারা অবিশ্বাস করে, তারা একে অপরের মিত্র।’’ তিন, অথবা, তারা নিরপেক্ষ থাকতে পারে, যার ফলে তারা মুনাফিক হয়ে যাবে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাঁর সুস্পষ্ট গ্রন্থে বলেছেন: ‘‘উভয়ের মাঝে দোদুল্যমান, [এদের] [বিশ্বাসীদের]ও নয়, [ওদের] [অবিশ্বাসীদের]ও নয়।’’
আপনারা কি দেখেছেন, তারা কীভাবে মুসলমানদেরকে অপরাধী ইরানিদের সাথে জোটবদ্ধ হতে বাধ্য করে? যদি তারা অস্বীকার করে, তবে তাদের দৃষ্টিতে, তারা হয় মুনাফিক অথবা কাফের। তাদের মানদণ্ড অনুযায়ী, উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং জর্ডান রাজ্যে আমাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে: জায়নবাদী আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে যখন ইরানি আগ্রাসনকারীরা আমাদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, তখন কি আমাদের তাদের সাথে দাঁড়ানো উচিত? আর যদি আমরা তাদের সাথে না দাঁড়াই, তাহলে কি আমরা কাফের অথবা মুনাফিক? আমাদের বিরুদ্ধে তাদের অপরাধের ভয়াবহতা এবং তাদের অবিচারের তীব্রতা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন? আপনি কীভাবে এভাবে বিচার করতে পারেন? আপনি কোন মানদণ্ডে পরিমাপ করেন? আপনি কোন ধরনের যুক্তি দিয়ে চিন্তা করেন?
ইরানি শত্রুর প্রতি তাদের সমর্থন একটি বিচ্যুতি, অবহেলার লক্ষণ, ইতিহাস বিস্মৃতি এবং স্মৃতিভ্রংশ। এটি একটি বিচ্যুতি, কারণ এর ভিত্তিই মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ, যা একটি ত্রুটিপূর্ণ উপসংহারে নিয়ে যায়। ইরান একটি ধর্মতান্ত্রিক, উগ্রবাদী সন্ত্রাসী, বর্বর এবং অপরাধী রাষ্ট্র।যা তাদের আগেকার কৃতকর্মের মাধ্যমে প্রমাণিত ও সত্যায়িত। আমরা কি এর আধ্যাত্মিক প্রকৃতির জন্য একে সমর্থন করব, নাকি এর অপরাধপ্রবণতা ও নৃশংসতার জন্য? ইতিহাস জুড়ে, আধ্যাত্মিক আন্দোলন কি বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগত ছিল, নাকি মুসলমানদের সমর্থক ছিল? তাহলে কি আমরা মুসলমানদের অপরাধীর মতো আচরণ করব? আপনার বিচারে ভুলটা কোথায়? আল্লাহর মহিমা, তিনি আপনার বর্ণনার ও ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে।
এই লোকেরা কীভাবে তাদের বিকৃত ধর্মীয় উদ্দেশ্য এবং মনগড়া মতবাদের কল্পকাহিনী সম্পর্কে এতটা উদাসীন থাকতে পারে, যা দিয়ে তারা ইতিহাস জুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে? আফগানিস্তানে তালেবান শাসন উৎখাত করতে দখলদার শক্তির সাথে তাদের জোটের কথা তারা কী করে ভুলে গেল? আর ইরাকে বাথিস্ট শাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আমেরিকানদের সাথে তাদের জোটের দিকে তারা কেন চোখ বুজে রইল? ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লেবাননে তাদের বর্বর অপরাধের কথা তারা কী করে ভুলে গেল?
সিরিয়ার শহরগুলো ধ্বংস এবং সেখানকার লক্ষ লক্ষ বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত করার দৃশ্যগুলো কি তাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠেনি? লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা কি তাদের আবেগকে নাড়া দেয়নি? সিরীয় তরুণদের জীবন্ত কবর দেওয়া কি তাদের হৃদয় ভেঙে দেয়নি? শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহের দৃশ্য কি তাদের বিবেককে নাড়া দেয়নি? বছরের পর বছর ধরে দিনরাত সিরিয়ার শহরগুলোতে তাদের বর্ষিত ব্যারেল বোমার শব্দ কি তাদের অন্তরে অনুরণিত হয়নি?
তারা কীভাবে এই সমস্ত নৃশংস অপরাধ এবং বর্বর আগ্রাসন ভুলে গিয়ে, তারপর মুসলমানদের সমর্থন ও সংহতি চেয়ে তাদের উস্কানি দিতে পারে? আপনারা কি চান মুসলিম জাতি এমন একটি দুর্বৃত্ত, অপরাধী রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াক, যার হাত নিরীহ, বিশ্বাসী ঈমানদার সুন্নিদের প্রাণের রক্তে রঞ্জিত? আপনার মহিমা হোক! এটি একটি গুরুতর অপবাদ নয় কি?
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আমরা তাদের মিলিশিয়া ও গুপ্ত গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে যা দেখেছি, তা-ই তারা বিগত শতাব্দীগুলোতে চর্চা করত। তারা কীভাবে তাদের বিকৃত ধর্মীয় উদ্দেশ্য এবং মনগড়া মতবাদের কল্পকাহিনী সম্পর্কে এতটা উদাসীন থাকতে পারে, যা তাদের ইতিহাস জুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধতে, বর্বর মোঙ্গলদের সাথে সহযোগিতা করতে এবং দখলদার ক্রুসেডারদের সাথে মিত্রতা করতে চালিত করেছে? আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে কারা ষড়যন্ত্র করেছিল এবং মুসলমানদের ভূমি ধ্বংস করার জন্য হালাকুদের পথ প্রশস্ত করেছিল? ১৮ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করতে কারা তাদের সাহায্য করেছিল? লেভান্তে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে কারা তাদের সমর্থন করেছিল? কারা মুসলিম শিশুদের আক্রমণকারী ও দখলদার শত্রুদের কাছে বিক্রি করেছিল এবং তাদের সম্পদ লুট করেছিল? কারা সালাহুদ্দিনের কাছ থেকে আলেকজান্দ্রিয়া দখল করার জন্য ক্রুসেডারদের সাথে মিত্রতা করেছিল? কারা পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ এবং অন্যান্য উপনিবেশ স্থাপনকারীদের সাথে মুসলিমদের ভূমির বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছিল?
এই লোকেরা কোন মূর্খতা ও ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে? তারা কোন রাষ্ট্রদ্রোহিতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? তাদের সেই মন কোথায়, যা দিয়ে তাদের চিন্তা করা উচিত, এবং তাদের সেই অন্তর্দৃষ্টি কোথায়, যা দ্বারা তাদের পরিচালিত হওয়া উচিত? কীভাবে তাদের বোধশক্তি এতটা আচ্ছন্ন ও দিশেহারা এবং তাদের স্বপ্নগুলো এতটা পথভ্রষ্ট হতে পারে? হে আমাদের প্রভু, আপনি আমাদের পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে বিপথে যেতে দেবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। নিশ্চয়ই আপনিই সর্বশক্তিমান।
তৃতীয়ত: তারপর, তৃতীয় ও চূড়ান্ত একটি ভ্রান্ত ধারণা, একটি বিপজ্জনক ও মিথ্যা দাবি: তারা বলে, “আমরা ইরানি রাষ্ট্রের পাশে আছি কারণ এটি জায়নবাদী রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত।” এটি পথভ্রষ্টতা, বিচ্যুত চিন্তাধারা, দুর্বলতা এবং প্রতারণা। অন্যথায়, আমাকে বলুন, আমি আপনাকে মিনতি করছি: তাদের মিলিশিয়া বা গুপ্ত গোষ্ঠীগুলো কবে জায়নবাদী আগ্রাসনকারীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল? জেরুজালেম এবং আল-আকসার পতাকা কি মুসলমানদের আবেগকে প্রভাবিত করার জন্য তাদের সাহিত্যে ব্যবহৃত স্লোগান ছাড়া আর কিছু ছিল? তারা কি তাদের ইতিহাসে ক্রুসেডারদের হাত থেকে আল-আকসা মসজিদকে মুক্ত করার জন্য একটিও যুদ্ধে মুসলমানদের পাশে থেকে লড়াই করেছে? বরং, তারাই আল-আকসা এবং ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করতে ক্রুসেডারদের সাহায্য করেছিল।
তারা কি ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ বা ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল? আপনি কি এমন একজনও ইরানির কথা শুনেছেন যিনি ফিলিস্তিনি ভূমিতে শহীদ হয়েছেন? তাদের উপেক্ষা করুন যাদের মন বিপথে গেছে এবং যাদের স্বপ্ন ছিল অলীক, যখন তারা অপরাধী সোলেইমানিকে জেরুজালেমের শহীদ বলে মনে করেছিল, অথচ সেই সিরীয় জনগণের রক্ত ঝরিয়েছিল।
আপনারা কি কখনো নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, এই নৃশংস কুদস ফোর্সের উদ্দেশ্য কী? এর লক্ষ্য কি আল-আকসা মসজিদকে মুক্ত করা, নাকি খামেনাঈর ভ্রান্ত ধারণা পূরণ করা? এটি কি ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থন করার হাত, নাকি এমন এক হাত যা সিরীয় জনগণের রক্তে মাখা রঞ্জিত অপরাধের প্রতিক, আর জায়নবাদী সত্তা অক্ষত থেকেছে? এটি মিথ্যাভাবে জেরুজালেমের নাম ধারণ করে এবং মিথ্যাভাবে আল-আকসার পতাকা উত্তোলন করে, কারণ এর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি জায়নবাদী সত্তার দিকে একটিও গুলি চালায়নি।
কোথায় ছিল এর সামরিক অস্ত্রাগার, এর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এর ধ্বংসাত্মক ড্রোন এবং এর হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা এখন আমরা আমাদের বাড়ির উপর বর্ষিত হতে দেখছি? কোথায় ছিল সেগুলো, যখন সারা বিশ্বের চোখের সামনে গাজাকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছিল? প্রকৃতপক্ষে, এই পৈশাচিক সত্তা এবং তার সন্ত্রাসী দলটি কোথায় ছিল, যখন কিছুদিন আগে এক নৃশংস ও বর্বর যুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণকে নির্মূল করা হচ্ছিল? নাকি সে সিরীয় জনগণকে হত্যা করতে, রুশ সেনাবাহিনী এবং অপরাধী সোলেইমানির আদেশ পালন করতে ব্যস্ত ছিল?
ইরান এবং তার অনুচরেরা দাগী অপরাধী, নিষ্ঠুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত, যারা নিপীড়ন, আগ্রাসন, অবিচার এবং স্বৈরাচারে নিমজ্জিত। কোনো বিশ্বাসীরই তাদের কাছ থেকে বিজয়ের আশা করা উচিত নয়, কিংবা তাদের কাছ থেকে কোনো সম্মান প্রত্যাশা করা উচিত নয়। যে ব্যক্তি তাদের উদ্দেশ্য সাধনে ইরানের সমর্থনের উপর আশা রাখে, তার অবস্থা এই প্রবাদের মতো: ‘‘যে ব্যক্তি বিপদে আমরের কাছে আশ্রয় চায়, সে যেন জ্বলন্ত বালু থেকে আগুনে আশ্রয় খোঁজা ব্যক্তির মতো।’’
যদি আমরা জায়নবাদী সত্তার উপর ইরানি শত্রুর আক্রমণের মধ্যে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণের জন্য আল্লাহর প্রতিশোধের কিছু অংশ দেখতে পাই, তবে মুসলিম দেশগুলোতে তাদের অতীতের বা বর্তমানের অপরাধগুলো আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তাদের ধর্মের সাথে সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাদের একমাত্র কাজ হলো আরবদের হত্যা করা। তারা এমন এক জাতি যারা এমন এক ধর্ম অনুসরণ করে, যার কথা আমি নবীর কাছ থেকে কখনো শুনিনি, এমনকি ধর্মগ্রন্থেও এর উল্লেখ নেই। আর যদি কেউ আমাকে তাদের ধর্মের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আমি বলি যে তাদের ধর্ম হলো হত্যা করা। সুন্নি মুসলিমদের হত্যা করা।
লেখক: ড. মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ মাদানী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মিডিয়া স্কলার