অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রক্রিয়াধীন ৩১টি প্রকল্প বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সেগুলো চালু রাখা যাবে কি-না, এ লক্ষ্যেই যাচাই করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
যাচাই-বাছাই করতে গত ৬ মে জ্বালানি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। আইন ও বাস্তবতার আলোকে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।
কমিটিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক এবং বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মাহাফুজার রহমানকে সদস্য করা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ও বিপিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম এ বিষয়ে বলেন, কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। যথাসময়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। আইন ও বাস্তবতা অনুযায়ী বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে।
জানা গেছে, ২০১০ সালের ‘কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্ট’-এর আওতায় ২০২২-২৩ সালে এলওআই পাওয়ার পর ৩১টি কোম্পানি প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার হাইকোর্টের একটি রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এসব কোম্পানির এলওআই বাতিল করে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, সরকারের উচিত ছিল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করা। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু সব প্রকল্প একসঙ্গে বাতিল করা ঠিক হয়নি।
তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের রায়ের শেষ অংশে বলা হয়েছিল, প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এসব চুক্তি পুনরায় আলোচনা করতে পারবে। সেই সুযোগ ব্যবহার না করে একতরফাভাবে সব প্রকল্প বাতিল করা সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ছিল না।
মন্ত্রণালয় ও বিনিয়োগকারী সূত্রে আরও জানা যায়, চলমান এসব প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করেছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগের সহায়তায় এসব প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, এলওআই পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ক্রয়সহ নানা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে এলওআই বাতিল হওয়ায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও করেন।
তবে বর্তমান সরকারের পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ১৫টির বেশি প্রকল্পের উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে শতভাগ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, ৩২০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ এবং ২৫ মেগাওয়াট বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প।
তাদের দাবি, প্রকল্প উন্নয়নের জন্য বিদেশি ঋণ ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে প্রায় ২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন।
পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই অর্থায়নে চীন, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।