রাজধানীর সরকারি সঙ্গীত কলেজের এক শিক্ষককে ঘিরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উত্তেজনা, গুরুতর অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ঘটনা সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
লোকসংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এম. এম. ইউনুছুর রহমানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, অসদাচরণ এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষক।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বিভিন্ন সময় ছাত্রীদের প্রতি অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন এবং ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অশালীন পোস্ট করেছেন। এ সংক্রান্ত স্ক্রিনশট ও ভিডিও প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আরও অভিযোগ করে জানায়, শিক্ষক হিসেবে নিজের অবস্থানকে ‘বড় হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরি করেন। পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া, কম নম্বর দেওয়া কিংবা একাডেমিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখিয়ে অনেককে তার কথা মানতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কিছু শিক্ষার্থী দাবি করেন, বিশেষ করে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে সহায়তার প্রস্তাব—যেমন বিসিএস প্রস্তুতি, চাকরির আবেদনপত্র তৈরি, কম্পিউটার সহযোগিতা, ব্যক্তিগত যাতায়াতের সুবিধা বা আর্থিক সহায়তা—দিয়ে প্রথমে তাদের আস্থা অর্জন করা হয়। পরবর্তীতে সেই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। মানসম্মান ও নিরাপত্তার ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারেন না বলেও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য।
আরও অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক বিভিন্ন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। এমনকি ছাত্রীদের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত নিয়মিত যোগাযোগ রাখার কথাও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।
গত রবিবার (২০ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে কলেজে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এক শিক্ষার্থী ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য গেট খুলতে চাইলে দারোয়ানকে তা না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরা তখন কলেজের ভেতরে বহিরাগতদের উপস্থিতির অভিযোগ তোলেন। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শেরে বাংলা নগর থানায় যোগাযোগ করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি কলেজের অভ্যন্তরীণ বলে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে চলে যায়।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক এম. এম. ইউনুছুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। বরং মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাকে টার্গেট করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি থানায় অভিযোগ করেছি, যেন বিষয়টি আইনগতভাবে সমাধান হয়। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, তাদের বিষয়গুলো পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ নাদিয়া সোমা বলেন, “শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর কিছুটা অভিমান করেছে। একজন শিক্ষার্থী বাথরুমে যেতে চাইলে দারোয়ান আমাকে ফোন করেছিল, কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও জানান, কলেজের এক স্টাফের সঙ্গে একজন বহিরাগত প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষার্থীরা বিষয়টিকে বড় করে দেখছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের লেখালেখির প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, “ওরা আমাদেরই ছাত্রছাত্রী। অভিমান থেকেই হয়তো এসব লিখছে। আমরা চাই না কলেজ, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের মানহানি হোক।”
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, “শিক্ষকরা অনেক সময় বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন, যার ফলে সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। শিক্ষকদের নিজেদের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলা উচিত।”
অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়েরের বিষয়ে তিনি বলেন, “আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তার রয়েছে। তবে পুরো ঘটনাটি মূলত ভুল বোঝাবুঝি ও অভিমান থেকে সৃষ্টি হয়েছে।”
এদিকে শিক্ষার্থীরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
ঘটনাটি নিয়ে কলেজজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে স্বচ্ছ তদন্তই পারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।