নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া রেললাইনের পাশে অবস্থিত “আরবান ইস্কুল এর নিত্যদিনের চিত্র। মাথার উপর গনগনে রোদ, টিনসেড ঘরের গুমোট গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ক্লাস রুমে থাকার কথা ছিল ফ্যান, কিন্তু সম্বল বলতে টিকে আছে শুধু ঝুলে থাকা কিছু বৈদ্যুতিক তাঁর। কারণ গত কয়েকদিন এ প্রায় সব গুলো গুলো ফ্যান চুরি হয়ে গেছে। সুপেয় পানির একমাত্র মোটরটিও এখন উধাও, সেটিও চুরির তালিকায় , তপ্ত দুপুরে এক ফোটা পানির তৃষ্ণায় নিয়েই ক্লাসে বসে থাকে কোমলমতি শিশুরা।
এটি কোনো বিজন গ্রামের দৃশ্য নয়, প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলা চাষাড়া রেল লাইনের পাশে অবস্থিত,শত অভাব আর প্রতিকূলতার মাঝে ও সেখানে প্রতিদিন লড়াই চলে টিকে থাকার নিয়মিত প্রতিদিনের চিত্র।
স্কুলটিতে অবকাঠামোর দৈন্যদশা থাকলেও অভাব নেই ভালোবাসার। এখানকার শিক্ষকরা কেবল পাঠদান করেন না, বরং তারা আগলে রাখেন এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। অনেক সময় নিজেদের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ক্ষুধার্ত শিক্ষার্থীদের মুখে খাবার তুলে দেন তারা। একজন মা যেমন সন্তানের কষ্ট সে পারেন না, এই শিক্ষকদের অবস্থা ঠিক তেমন। সাধ্যের অভাবে শিশুদের ন্যূনতম চাহিদা পুরণ করতে না পারায় আক্ষেপ ঝরে পড়ে তাদের চোখে মুখে।
২০০২ সালে এক বুক আশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, আরবান ইস্কুল। এক সময় এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ শতাধিক। তখন নিয়মিত মিলতো পুষ্টিকর খাবার ও পোশাক, কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে সব ধরনের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুকছে স্কুল প্রতিষ্ঠানটি।
জরাজীর্ণ এক কক্ষেই গাদাগাদি করে চলছে তিনটি ক্লাসের কার্যক্রম। নেই পর্যাপ্ত চেয়ার- টেবিল, বা মানসম্মত পড়াশোনার পরিবেশ। এত সীমাবদ্ধতার পরেও আরবান স্কুল তার সাফল্য অবিচল রয়েছেন। এখান থেকেই পড়াশোনা পরে অনেক শিক্ষার্থী ট্যালেন্টফোল ভিত্তি পেয়েছেন। আজ তাদের অনেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দোর গোড়াই পৌঁছে গিয়েছে।
এই জরাজীর্ণ ঘরটি মূলত বঞ্চিত শিশুদের বড় স্বপ্ন দেখার সাহস যোগায়। কিছু ফ্যান, একটু বিশুদ্ধ খাবার পানি আর সামান্য সহযোগিতা- এতোটুকুই পারে শত শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে । মানবিক জেলা প্রশাসক সহ সমাজের বিত্তবান ও দায়িত্বশীলদের অতি আকুল আবেদন জানানো হয়েছে যেনো তারা একবার স্কুলটি পরিদর্শন করতে আসেন।
স্থানীয়দের চাওয়া, টিকে থাকুক আরবাল স্কুল, বেঁচে থাকুক কয়েকশো বঞ্চিত শিশু ও শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। এই শিশুদের হাসি মুখ ফেরাতে একটু সহযোগিতায় দেখাতে পারে শত শিক্ষার্থীর আলোর পথ।
স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা মাহমুদা কাওসার জানান, ২০০৬ সাল থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। এবং অনেকেই বৃত্তি অর্জন করেছে, জেলা প্রশাসক ও উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা স্কুলের সাফল্যে খুশি হয়ে বিশেষ বিবেচনায় সরকারি আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো টিকে থাকা।
বিদ্যালয়টির জন্য ৮ শতাংশ জায়গা দান করা হলেও অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। এক একটি শ্রেণীর জন্য আলাদা কক্ষ না থাকাই একই রুমে তিনটি ক্লাস চালাতে হয়।
শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলে অনেক কোন যথেষ্ট চেয়ার টেবিল কিংবা পড়াশুনার উপযুক্ত পরিবেশ। সাত জন শিক্ষক ও দুইজন কেয়ারটেকার থাকলেও বেতন ও ভাতা দেওয়ার নামমাত্র, তবুও তারা নিষ্ঠার সঙ্গে বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। প্রধান শিক্ষিকা নিজেও প্রায় ই নিজের টিফিনের টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের খাবার কিনে দেন। তিনি আরও বলেন, শিশুরা কখনও কলম,খাতা বা জামা কাপড় আবদার করে, আমরা দিতে পারি না,সন্তান যখন মায়ের কাছে খাবার চায়, মা দিতে না পারলে যেমন বুক ফেটে যায়, ঠিক তেমনই কস্ট হয় আমাদেরও।
অন্য স্কুলে সুযোগ পেয়েও আমি এখানেই আছি কেবল এই অসহায় শিশুদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য। আমি চাই মনে প্রাণে এই বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে স্কুলটি যেনো আরো এগিয়ে নিয়ে যায় বেঁচে থাকুক।